যে দিক পানেই চাই, গর্বের স্থান নাই

পুরুষদের টেনিসে রজার ফেডেরার কিছুদিন আগে পর্যন্ত কুড়িটা গ্র্যান্ড স্লাম জিতে সবচেয়ে গর্বের জায়গায় ছিলেন, তার পরেই দেখা গেল প্রথমে রাফায়েল নাদাল পরে নোভাক জিওকোভিচ তাঁকে পেরিয়ে যাওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। এরকম ঘটতেই থাকে কারণ আমেরিকান লেখক ও দার্শনিক এলবারট হাবার্ড যেমন বলেছেন, “পৃথিবী ইদানীং এত তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে যে, কেউ ‘এই কাজটা করা যাবে না’ বলা শুরু করলে তাকে থামিয়ে আর একজন সেটা করে দেখিয়ে দিচ্ছে।” (The world is moving so fast these days that the man who says it can’t be done is generally interrupted by someone doing it. –Elbert Hubbard

গর্ব দু’রকম আত্মগর্ব আর পরগর্ব। বিখ্যাত মানুষ-খেলোয়াড় বা কবি যাই হোন, নিজেদের শ্রম আর প্রয়োগে লক্ষ্যণীয় আত্মশ্লাঘার (গর্বের) অধিকার অর্জন করেন। তবে, আত্মগর্ব ছাড়া জীবন লবণ বিহীন হয়ে যায় বলে আমরা সাধারণ মানুষরাও নানা রকম আত্মগর্বের রসদ জুটিয়ে ফেলি। কেউ বাজারে ভাল মাছ চেনেন, কেউ অবিকল মহম্মদ রফি বা আশা ভোঁসলের মত গান করতে পারেন, অথবা মুক্তাক্ষরে লিখতে পারেন… ইত্যাদি। 

পরগর্বের ক্রীড়াভূমি হ’ল নিজের সাথে সরাসরি যোগাযোগবিহীন বিষয়। তাঁদের কোন কাজে আমার যোগদান?- না ভেবেই, সুভাষ, গান্ধীজি বা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের গর্ব এই দলে। জন্মের ব্যাপারে নিজস্ব কোন হাত না থাকা সত্ত্বেও পরগর্বে প্রভাবিত লোক মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ায় গর্বিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ বলেন, এদেশে বা এই পরিবারে জন্ম নিয়ে আমি গর্বিত। নিজেরা না খেলে খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্ব, তার থেকে আর একটু এগিয়ে অতি বিশৃঙ্খল মানুষও প্রায়ই সৈন্যদলের শৃঙ্খলা নিয়ে গর্বিত হয়ে পড়েন।

প্রশ্ন হচ্ছে, গর্ব নিয়ে এত হুড়োহুড়ি আর উদ্বেগের কোন সত্যিকার কারণ আছে কি না? আত্মগর্বী আমাদের ‘নিজস্ব’ কৃতিত্বই বা কতটা নিজের? নিজের কথাই ভাবি- কিছুদিন আগে বিষ্ণুপুরে মন্দিরের গায়ে প্রাচীন বাংলা পড়ে বুঝতে যে আমার ঘাম ছুটে যাচ্ছিল সে-ই যে আজ ঝরঝরে বাংলায় এতটা লিখে ফেললো তার পেছনে কি রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সুকুমার রায় এবং আরও বহু ভাষাবিদ, লেখক ও সংস্কারকের অবদান নেই? কম্পিউটারে টাইপ করছি, সে বলছে বাংলা লেখার অভ্র সফটওয়্যার যারা বানালো তাদের কথা বলবে না?

তা ছাড়া, যা লিখছি বা বলছি সে চিন্তাগুলোও আমার কি? খতিয়ে দেখলে বই-এ বা কাগজে পড়া অথবা ইদানীং ইউটিউবে শোনা অন্যদের ভাবনা তাদের সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে মাথায় গোল পাকিয়ে তথাকথিত ‘আমার’ ভাবনাগুলো তৈরি হচ্ছে। হ্যারি পটারের গল্পের ভিলেন ভলডেমর্ট-এর কোন শরীর নেই, দুষ্কর্ম করার জন্য তাকে সুবিধেমত অন্য কারও শরীর দখল করতে হয়। ভাবনাগুলোও যেন সেই রকম। বাতাসে ঘুরতে ঘুরতে সুবিধেমত কাউকে পেলে তার লেখা বা কথায় নিজেকে ফুটিয়ে তোলে। একই আইডিয়া একসাথে অনেকের মাধ্যমে বেরিয়ে পড়ার কারণ সেটাই- বৃটিশ নিউটন আর জার্মান লিবনিজের প্রায় এক সাথে ক্যালকুলাস আবিষ্কার সেরকম একটি ঘটনা। প্রায় সব পুরস্কারের ওপরে যে নোবেল প্রাইজ, আজ এক জন বা কয়েক জনকে দেওয়া হয়, তাঁদের সাফল্যের পিছনেও বহু তথাকথিত বহু অসফল মানুষের ভিড়। তারা নানা রাস্তায় গিয়ে ব্যর্থ হয়ে বলে দেন, ‘অন্য দিকে যাও’ তাই সময় বাঁচে, সফলতা আসে। 

নিজের চেষ্টা আর ভাগ্য ছাড়া গর্বিত সার্থকতার মিনারগুলি অপরের অদৃশ্য ব্যর্থতার জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের কাজের ক্ষেত্র থেকে তার উদাহরণ ভূরি ভূরি- রাজস্থানে এক জায়গায় ভারতের ওএনজিসি আর ডাচ শেল কোম্পানী বেশ ভাল ভাল জায়গায় ড্রিল করে (বাজেট ফুরিয়ে) বিদায় নেবার পর ব্রিটিশ কেয়ার্ন কোম্পানী তাদের না দেখা নিরেস জায়গায় ড্রিল করে অনেক তেল পায়। বলা বাহুল্য, আগের দুটো কোম্পানী ব্যর্থ না হলে কেয়ার্ন-ও তাদের ব্যর্থতার জায়গায় ড্রিল করে বাজেট ফুরিয়ে বিদায় নিত। ইন্দোনেশিয়ার মাহাকাম ব-দ্বীপেও এভাবেই বহু ব্যর্থতার পর বিশাল সাফল্য আসে । 

পাঠক এক মত হবেন কি না জানি না, লক্ষ্য করলে দেখা যায় গর্ব অনেক ভয়াবহ যুদ্ধের রসদ। জার্মান জাতির গর্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে তিন থেকে ছ’কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে বহু পরিবার এমনকি নিজেদের দেশ ধ্বংস করেও ফেলেছিল। তার আগে প্রোটেস্টান্ট আর ক্যাথলিকদের ত্রিশ বছর যুদ্ধ (১৬১৮-৪৮) তদানীন্তন ইউরোপে ৪৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।  এখনও  জাতি, ধর্ম অথবা গোষ্ঠী নিয়ে গর্বে বহু দেশ সঙ্কটাপন্ন। 

বাংলা ডিকশনারিতে গর্ব শব্দটির মানে খুঁজে গর্বিত হবার মত কিছু পাওয়া গেল না, (গর্ব – অহংকার, আত্মশ্লাঘা, দর্প; pride; conceit; vanity; boasting) বরং সেই অনুভূতিটির কারণে বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব উৎপত্তির আভাস পাওয়া গেল। এত কচকচির পর বিরক্ত হয়ে শব্দটি আমাদের ত্যাগ করে বনবাসে গেলে জীবনের কোণে কোণে সে যে শূন্যতা রেখে যাবে তা ভরবো কি দিয়ে? আবার ডিকশনারিতে ফিরে খুশি হলাম (খুশি- আনন্দ, আহ্লাদ, আমোদ; happiness, joy, delight)। লক্ষ্য করলে দেখবেন বহির্মুখী, অতৃপ্ত, উচ্চকিত গর্বের তুলনায় খুশি অনেক শান্ত, অন্তর্মুখী, পূর্ণতার অনুভূতি। দেশের জন্য, পরিবারের জন্য, নিজের অর্জনের জন্য… গর্ব নয়, আমরা বরং খুশি হই।

এতটা পড়ে আপনাদের কি হবে জানি না তবে প্রবন্ধের সদাশয় ভলডেমর্ট আমাকে দিয়ে লেখাটি করিয়ে নেওয়ায় বেশ খুশি খুশি ভাব হচ্ছে আমার।

১১ই মার্চ, ২০২৩                                                                                              -অরিজিৎ চৌধুরী

 

About the author

Arijit Chaudhuri, located in Navi Mumbai, petroleum geologist by profession. Also interested in issues concerning pollution, climate change and fast depleting groundwater reserves.Travelling, reading, writing articles, composing rhymes and recitation are his hobbies.