
আমার বাল্যকালটা কেটেছিল মস্ত একটা বাড়িতে।
না না, শহর কলকাতায় নয়, এমনকি কোনো শহরের মধ্যেও নয়। শহর কলকাতা থেকে দুই শত মাইল পশ্চিমে বেহার প্রদেশের দোরগোড়ায় এক ছোট কসবা-তে । সেকালে এই গিরিডি-মধুপুর-কার্মাটাঁড় অঞ্চল কলকেতার বাঙালির কাছে হাওয়াবদল করতে যাবার জন্যে ছিল ‘পশ্চিম’। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-মশায়ের শেষজীবনটা এই অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষজনের মধ্যেই কেটেছিল।
আমার দাদু, অর্থাৎ মায়ের বাবা ছিলেন এক রিটায়ার্ড জজ। দিদিমা মাতৃসমা, কারণ আমার মা-কে কখনও চোখে দেখিনি আমি। আমার জন্মের পরে পরেই তিনি দেহ রেখেছিলেন, শুনেছি। আমার বাবা চাকুরি করতেন আসামের দিকে সরকারী জরিপ বিভাগে, কালেভদ্রে আসতেন এই শ্বশুরবাড়িতে,আমাকে দেখতে।
মস্ত বড় বাগান-পুকুর ঘেরা হাতার মধ্যে ধবধবে সাদা একটা একতলা বাড়ি, মাথাটা গোল। অনেক উঁচু ভিত। দশ ধাপ লাল চওড়া সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসতে হতো বাড়ির একতলায়। কে কবে এই বাড়ি বানিয়েছিল জানতাম না, দাদুই বা কী সূত্রে এই বাড়ি কিনেছিলেন তাও জানতাম না।
ঐ বাড়িতে আমার সবচেয়ে পুরনো যে স্মৃতি রয়েছে তাতে আমি দিদিমার আঁচল ধরে ধরে সারা বাড়িময় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বা, উনি উল বুনলে বা কুরুশের কাজ করলে হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি কেমন রঙীন প্যাটার্ন হয়ে হয়ে উঠছে!
দাদুর ছিল বইয়ের শখ। বিশাল লাইব্রেরি ঘর ছিল,আমরা বলতাম পুবের ঘর। আমার জন্যে কলকাতা থেকে বিশেষ অর্ডার দিয়ে নানান রঙচঙে বই, রংমশাল-শুকতারার মতো পত্রপত্রিকা ইত্যাদি আনাতেন। খুব ছোটবেলা দাদু-দিদিমাই পড়ে পড়ে শোনাতেন আমাকে। একটু বড় হয়ে পড়তে শিখলে গোগ্রাসে গিলতাম আমি সে সব। শিক্ষার্থীকে ইস্কুলে পাঠানোর বিরোধী ছিলেন দাদু। সে দিক দিয়ে উনি মার্কিন জন রাশডুনি সাহেবের ‘হোম-স্কুল আন্দোলনের’ সমর্থক ছিলেন; তাঁর সঙ্গে দাদুর পত্রাচারও চলত।
ক্লাস এইটের আগে আমি স্কুলের মুখ দেখিনি, যখন হস্টেলে ভর্তি হয়েছিলাম।
তবে হ্যাঁ, আমার দাদু-দিদা কখনই আমাকে স্থানীয় ছেলেপুলেদের সঙ্গে মিশতে বা খেলাধুলা করতে বাধা দিতেন না। পরে একটু বয়স হলে ভেবে দেখেছি, সেকালের বিহারপ্রদেশে এক বাঙালি জজসাহেবের নাতি পথের ধুলায় ভুলু-নেহাল-সতু-রাবেয়াদের সঙ্গে গুলি বা চু-কিৎ কিৎ খেলছে---এটা কিন্তু খুব কমন দৃশ্য ছিল না। দাদু যদিও এই মিলমিশটাকে শিশুর শিক্ষার একটা অঙ্গ বলেই মনে করতেন, যা থেকে লাভবান হয়েছি আমি।
পড়শী বালক সতু, অর্থাৎ সত্যেন, ছিল আমাদের থেকে বয়সে সামান্য বড়। যথেষ্ট ঢ্যাঙাও। চারদিক থেকে নানান খবর আমদানি করে এনে এনে আমাদের অবাক করে দিয়ে মজা পেত সে। এইভাবে একটা নেতা নেতা ভাবও বজায় রাখত আমাদের জনা সাত-আট বন্ধুদলের মধ্যে।
যেমন, একদিন সে এসে জানালো, ওরে তোরা জানিস কি, মোতিচৌকে একটা তাঁবু পড়েছে। বায়স্কোপ দেখানো হবে তাতে। দিলীপকুমার হলো তার হিরো।
ঊনিশশ’ পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের গল্প এ’।
কথাবার্তা আমাদের স্থানীয় ঠেট হিন্দিতেই হতো। তাকে বলত ‘খোট্টা ভাষা’। আজ এতো বচ্ছর পরেও এ’ ভাষায় আমি যথেষ্ট সড়গড়।
কিন্তু বাচ্চাদের সিনেমা দেখতে যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, না আমাদের কাছে পয়সা থাকত। কিন্তু বায়স্কোপের রূপালী জগৎ সম্পর্কে নানান উপাদেয় জ্ঞান বিতরণ করতো সতু, আর হাঁ করে শুনতাম আমরা ডাংগুলি খেলা ফেলে।
আমার বয়স তখন পুরো দশ হয়নি।
সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে আমাকে পড়াতে আসতেন হরিবাবু স্যর। অঙ্ক কষাতেন। মোটাসোটা মধ্য বয়স্ক এক মানুষ। বড়ই শীতকাতুরে।
সেকালের গিরিডিতে তখনও বিজলিবাতি আসেনি।
সেদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেসই করে ফেললুম, ‘আচ্ছা মাস্টারমশায়, আপনি কি সিনেমা দেখেছেন ?’
ভয়ংকর অবাক হলেন উনি। রেগেও গেলেন। কড়া গলায় শুধালেন, ‘এ’সব কোত্থেকে শিখছ হে?’
দাদুর কড়া হুকুম ছিল ছাত্রকে তুই-তোকারি করা চলবে না। এবং চলবে না প্রহার করা।
সতু, আর মোতিচৌকে বায়স্কোপের তাম্বু পড়ার খবরটা স্যরকে দিতে উনি গজ গজ করতে লাগলেন, ‘কত করে জজসাহেবকে বলেছি নাতিকে পাড়ার ফালতু ছেলেপুলেদের সঙ্গে মিশতে দিবেন না, দিবেন না…..’
এই গম্ভীর হরিমাস্টারের কাছে পড়া থেকে দৈবাৎ রেহাই পেয়ে গিয়েছিলাম আমি যখন উনি বদলি হয়ে গিরিডি ছেড়ে চলে যান। বাংলা-ইংরিজি-সংস্কৃত তো দাদুই আমাকে পড়াতেন বড় যত্ন করে, ‘ভট্টিকাব্য’ তখনই আমার অনেকটা মুখস্থ, কিন্তু গণিতের জন্যে আমার গৃহশিক্ষক হিসেবে কাকে নিয়োগ করা যায় কাকে নিয়োগ করা যায় ….ভাবতে ভাবতেই আমার জীবনে তাপসদাদার আবির্ভাব ঘটে যায় যেটা ছিল একটা বড় ঘটনা।
তাপসদাদা আমাদের কী রকম যেন আত্মীয় হতেন।
বছর চব্বিশ-পঁচিশের এক ঢ্যাঙা যুবক। হাসি হাসি মুখে পাতলা দাড়ি গোঁফ। ঢোলা পাজামা-পাঞ্জাবী পরেন। প্রথমদিন ওঁকে দেখেই ভালো লেগে গিয়েছিল আমার। জানা গিয়েছিল, উনি কিছুকাল আমাদের এই গিরিডির বাড়িতেই থাকবেন। স্বাস্থ্যোদ্ধারে তো আসেননি। বোধহয় এম.এ. বা বড় কোনো এক পরীক্ষার তৈয়ারি করতে এসেছিলেন। সঙ্গে অনেক বই।
দাদু রিলিফ পেলেন। বললেন, ‘এই তো তাপস এসে গেছ! তুমিই বাপু তাহলে এখন থেকে দিলু-র অঙ্কটা একটু দেখিয়ে দেবে। তুমি প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্স পড়তে কিনা?’
প্রথম দিনেই হেনরি ডুডেনি-র বই থেকে একটা গাণিতিক পাজল করতে দিয়ে চমকে দিলেন উনি আমাকে। এর পর থেকে অঙ্ক আর আমার কাছে নীরস লাগত না, বরং নানান বই ঘেঁটে নিত্যনতুন গাণিতিক পাজল আবিষ্কার করে করে ওঁকেই তাক লাগিয়ে দিতাম আমি।
এক সকালে ব্রেকফাস্টের পরে আমাকে অঙ্ক কষাতে কষাতে তাপসদা শুধালে আমায়, ‘ভাই দিলু, বল তো লেখাপড়া করে কেন মানুষ?’
আমি দশ বছরের বালক, কী জানবো এই কঠিন প্রশ্নের এর উত্তর?
অনুমানে বলি, ‘কেন আবার? পাশ করতে। ভালো চাকরি পেতে। এই যেমন তুমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করবে বলে…. ’
----‘উঁহুঃ। হলো না, হলো না। না আমি ঐ পরীক্ষা দিচ্ছি, না আমি তার জন্যে এই পশ্চিমে এসে রয়েছি এখন। ’
----‘তবে?’
----‘পরম জ্ঞানলাভের জন্যে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এক রাজপুত্র সংসার ছেড়ে এসে তোদের এই অঞ্চলে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেরিয়েছিলেন। কাছেই গয়াতীর্থে নিরঞ্জনা নদীতীরে তাঁর মোক্ষলাভ হয়।।’
----‘গৌতম বুদ্ধদেব।’
----‘ঠিক। তাহলে তো জাতকের গল্পও শুনেছিস?’
----‘শুনেছি,শুনেছি বৈকি! দিদিমার মুখে।’ মহা উৎসাহে বলে উঠলাম আমি। কী চমৎকার চমৎকার সব গল্প! শিবি রাজার গল্প, সোনার প্রদীপের গল্প, হস্তীরাজের গল্প। পরমপুরুষ বুদ্ধদেবের আগের আগের আগের সব জন্মের কথা।’ আমি বললাম।
----‘বেশ। আচ্ছা,বল তো, গত জন্ম যদি থেকে থাকে, বা গত গত গত জন্ম, তবে আগামী আগামী আগামী জন্মও কি নেই? ইঁদুর-সওদাগর বা কটা চুলো রাজা বা বকধার্মিক হয়ে হয়ে যদি এক এক জাতক, অর্থাৎ এক এক জন্ম, হতে পারে, তো পরের কালেও কি উনি নব নব রূপে জন্ম নিতে পারেননি?’
----‘তা কী করে হবে হে? গৌতম-বুদ্ধদেবের তো মহাপরিনির্বাণই ঘটে গিয়েছিল। সেক্ষেত্রে তো ওঁর আর পুনর্জন্ম নেবার কথা নয়।’
আমরা খেয়াল করিনি, দাদু কখন এসে ঘরের জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে রোদ পোহাতে পোহাতে আমাদের গল্প শুনছিলেন।
----‘আসুন আসুন দাদু, ভিতরে আসুন। আপনি যে এসেছেন….’
----‘তা বাবা তাপস, পদার্থবিদ্যার ছাত্র হয়েও তোমার যে বৌদ্ধ ইতিহাসে এতোটা উৎসাহ আছে তা তো জানতাম না।’
এরপর দাদু ও তাপসদাদার মধ্যে এ’সংক্রান্ত কত কথা হতে লাগল। আমি তার বেশিরভাগটা বুঝতেই পারলাম না। তাই ঘরের বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে আকাশে দেখতে লাগলাম নানান রঙের ঘুড়ি উড়ছে। নিশ্চয়ই আমারই বন্ধুরা---সতু-পরেশ-আলতাফ ওড়াচ্ছে কাছের ভিঙ্গীর মাঠ থেকে। আমারও খুব ইচ্ছে করতে লাগল ওদের সঙ্গে গিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে।
রবীন্দ্রনাথের চাইতে বয়সে বড়, জ্যোতিদাদার কাছাকাছি বয়সের এক জার্মান ভারত-বিশারদ এই বিহার-উত্তরপ্রদেশের অনেক অনেক স্থানে কাজ করে গিয়েছিলেন ১৮৮০-৯০এর দশকে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রাঁচির আবাসে উনি গিয়েছিলেন কয়েকবার, সম্ভবত ওঁর সঙ্গে সাহেবের পত্রালাপও চলত। এই সাহেব চাকুরি করতেন আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব্ ইণ্ডিয়াতে। এই অঞ্চলে বুদ্ধের যাত্রাপথ ও ধর্মপ্রচার সংক্রান্ত অনেক অনেক আবিষ্কার ওঁর আছে যদিও অনেক ভ্রান্ত ও নকল আবিষ্কারের দায়ও উনি এড়াতে পারেন না। এ কারণে ওঁর চাকুরিটিও চলে গিয়েছিল। নামটি ছিল তাঁর ডাঃ এন্টন ফুয়েরর।
না, এ’গল্প তাপসদাদা করেননি, বরং শুনছিলেন (তাঁর সঙ্গে আমিও ) এক সন্ধ্যায় দাদুর বৈঠকখানায় এক ব্রাহ্ম-সভায়।
ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, আমার দাদুর বাড়ি কিন্তু ধর্মবিশ্বাসে ব্রাহ্ম ছিল, এবং সেকালে ও’অঞ্চলে ব্রাহ্মদের একটা বড় সংগঠন ছিল। তাঁদের রীতিমত মিলনোৎসব হতো, আবার অনেকে দাদুর কাছে এমনিই আসতেন গল্পগাছা করতে কোনো সন্ধ্যায়, বা রবিবারের সকালে।
দাদুর বৈঠকখানাঘরে বসে সেই সন্ধ্যায় জনা-সাতেক সভ্যের সামনে চা ও কচুরি সহযোগে জলযোগ সারতে সারতে এ’গল্প যে বয়স্ক ব্যক্তি করছিলেন তাঁকে দাদুই ‘বড়ে-ভাইয়া’ বলে ডাকছিলেন। চায়ের বাটি নামিয়ে রাখতে রাখতে তিনি বললেন, ‘ঠগ হোক্ আর যা-ই হোক্ এন্টন ফুয়েররের ডায়েরিতে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমার অঙ্ক মিলিয়ে কোনো স্থানের সঠিক অবস্থান মাপার যে প্রাচীন বৌদ্ধ পদ্ধতির হদিশ খুঁজে পাওয়া যায় তা কিন্তু তুলনাহীন…. ’
---‘কিন্তু সেটা কি আসলে গ্রীক পদ্ধতি নয়? গণিতজ্ঞ ইরাতোস্থেনিস ছিলেন এর আবিষ্কর্তা। ’ তাপসদাদা বললেন।
বারান্দায় দাঁড় করানো মস্ত গ্রান্ডফাদার ক্লকে ঢং ঢং করে সন্ধ্যা সাতটা ঘোষণা করল। শীতকালের হিসেবে ভালোই সন্ধ্যে হয়েছে।
---‘সেটা তো বিতর্কিত, বৎস, যথেষ্ট বিতর্কিত। বিদ্যেটা ভারত থেকে গ্রীসে গেছে, না ওখান থেকে এখানে? কে জানে? তা, ভালো কথা, আপনার সঙ্গে তো আলাপ হলো না, ভাই।’ বললেন সেই সদাশয় ভদ্রলোক।
এর পরে ঐ রায়সাহেবের সঙ্গে তাপসদাদার আলাপ হয়ে যেতে দেরি হলো না। দু’জনেই বৌদ্ধশাস্ত্র ও ইতিহাসে উৎসাহী।
‘তথাগত প্রভুর জীবনে একটা বড় প্রহেলিকা বল, বা লুপ্ত তথ্য,---সেটা কী ছিল জানো কি?’
‘জানি না। আপনি বলুন।’ তাপসদাদা বললেন।
‘কপিলাবস্তুর গৃহত্যাগ করার পর থেকে প্রথম দু’ বছরের ইতিহাস তবু জানা যায়, যখন কঠোর উপবাস-ও-তপস্যায় হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তারপর নিলেন ‘মজ্ঝিম্ পন্থ্’ । মধ্যম পন্থা।
এর ছয় বছর পরে তাঁকে গয়াধামে নিরঞ্জনা নদীতীরে সুজাতার দেওয়া পরমান্ন খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করতে দেখি, যতদিনে তিনি ধ্যানবলে লাভ করে ফেলেছেন পরম জ্ঞান। হয়ে উঠেছেন বোধিসত্ত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোথায় ছিলেন তিনি এই ছয় বছর? কে তাঁকে দেখালেন সাধনমার্গ? গুরু ছাড়া মোক্ষলাভ হয় কি? ঈশাপ্রভুর জন্য ছিলেন কাশ্মীরী গুরু চেতন নাথ, আদি শঙ্করাচার্যের ছিলেন শ্রীগোবিন্দ-ভগবৎপাদ, দেবদূত জিব্রাইলের কথাও আমরা পড়তে পাই। তিনশ’ বছরের ব্যবধানে শ্রীচৈতন্যদেব ও পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গুরু ছিলেন পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত সাধুদ্বয় ।
কিন্তু বুদ্ধতথাগতদেবের গুরু কে ?
এতোবড় বৌদ্ধশাস্ত্রে কোত্থাও লেখা নেই !
আমার বুক ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করেছে। তাই তো, এ’দিকটা তো আগে শুনিনি কোনোদিন। এ’তথ্য যদি আবিষ্কার করা যায় মস্ত একটা কাণ্ড হবে বটে।
আমি তখন মোটে বছর দশেকের এক বালক হলেও এডভেঞ্চারধর্মী গল্পে উৎসাহ রাখতাম খুব।
ঢং ঢং করে রাত ন’টা বেজে গেল। জজসাহেবের বাবুর্চিরা ডিনার সাজিয়ে দিয়েছে অলরেডি । দিদিমা রাতের খাবার খেতে ডাকছেন আমাদের । সান্ধ্য অতিথিগণ একে একে বিদায় নিলেন।
---‘মা, আমি আজ একটু মধুপুরের দিকে যাব। ফিরতে হয়ত সন্ধ্যা হয়ে যাবে।’ ব্রেকফাস্টের পরে তাপসদাদা বললেন দিদিমাকে, যাঁকে উনি, কেন জানি না, ‘মা’ বলে ডাকতেন, যদিও সম্পর্কে উনি ওঁর দিদিমাই হতেন।
---‘দুপুরের খাওয়া?’ দিদিমার প্রশ্ন।
---‘সে আমি কোথাও কিছু মিছু খেয়ে নোব এখন।’
আমি বায়না ধরলাম, আমিও যাবো দাদার সঙ্গে।
দাদু সাধারণত এমন অনুরোধে না করতেন না।
অতএব, আমিও চললাম কোট-প্যান্ট পরে। শীতকাল ছিল কিনা তখন।
লোকাল ট্রেনে যেতে যেতে তাপসদাদা বলল,
---- ‘হ্যাঁ ভাই দিলীপ, পূজারিনী কবিতাটা পড়া আছে কি তোমার?’
----‘নৃপতি বিম্বিসার। নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইলা পাদনখকণা তাঁর….’ বেশ জোরে জোরে আবৃত্তি করে উঠলাম আমি ।
----‘পাদনখ দিয়ে কী হবে?’
----‘স্থাপিয়া নিভৃত প্রাসাদ কাননে, তাহারি উপরে রচিলা যতনে, অতি অপরূপ শিলাময় স্তূপ শিল্পশোভার সার….’
----‘বেশ, বেশ। এবার শোন’, তাপসদাদা বলে চলেন, ‘সেকালে তো আর ফটো তোলা যেত না। তাই গুরুর চুল-দাড়ি-দাঁত-নখ চেয়ে এনে কোনো কোনো শিষ্য তারই পূজা করতেন। কাশ্মীরে গেলে দেখতে পাবে নবী সাহেবের দাড়ির একটি পবিত্র চুল এনে তাকে কেন্দ্র করে দরগা গড়া হয়েছে, লক্ষ লক্ষ পুণ্যলোভী যায় সে তীর্থে। তথাগত বুদ্ধের মহাপরিনির্বানের পরে তাঁর এমন অনেক অনেক দেহাবশেষ বা ভস্মাবশেষ সংগ্রহ করে নিয়ে নিয়ে ভক্তশিষ্যগণ স্তূপ বানিয়েছিল এই ভারতবর্ষের নানান কোণে কোণে । শুধু তা-ই নয়, তাঁর নিত্য-ব্যবহৃত দ্রব্য, যেমন ভিক্ষাপাত্র (মাটির সরা), কন্থা (কাঁথা), উত্তরীয়, দণ্ড প্রভৃতি নিয়েও স্তূপ বানানো হতো। পূজার স্থল। এমন অজস্র স্তূপের মধ্যে মাত্র কয়েকটিই এখনও পর্যন্ত বেঁচে আছে, বা উদ্ধার করা গেছে এই ভারতভূমে ; এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে । বহু বহু স্তূপ উদ্ধারই হয়নি। হয়তো এতোদিনে মাটিতে মিশে গেছে সে সব।
এইরকম দু’একটি রেলিক নাকি তিনি আবিষ্কার করেছেন বলে সেই জার্মান ভারতবিদ্ এন্টন ফুয়েরর দাবি করে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন ১৮৯০-এর দশকে, যদিও পরে প্রমাণিত হয়েছিল তার মধ্যে অনেকটাই ছিল নকল, বানানো।
----কুইক, কুইক। আমাদের এই স্টেশনে নামতে হবে, দিলু। নামো, নামো। ’
এই সব কথাবার্তা চলতে চলতেই মধুপুর আসবার অনেক আগে একটা স্টেশনে হঠাৎ আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামিয়ে নিল তাপসদাদা।
তাকিয়ে দেখলাম স্টেশনের নাম ‘জগদীশপুর’.
আজ এখানে তড়িঘড়ি এসে নামার কারণ যা জানা গেল তাপসদাদার কাছ থেকে তা হলো সেই গ্রীক-বা-বৌদ্ধ ভূগণিতবিদ্যার ক্যালকুলেশনের সঙ্গে আজকের কাঁটা-ও-কম্পাস মিলিয়ে মিলিয়ে যে প্রিসাইজ লোকেশন উনি খুঁজে পেয়েছেন সেটি নাকি এই জগদীশপুর স্টেশনের আশেপাশেই অবস্থিত।
কোনো টাঙ্গাগাড়ি ধরে নয়, আমরা তাই ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে সেই প্রাইম লোকেশনের দিকেই এগিয়ে চললাম যেখানে নাকি বোধিসত্ত্বের এক দেহাবশেষ গাঁথা আছে।
হয়ত, পাদনখই! ভাবো!!
মাঝেমাঝেই দাদা কাঁটা-কম্পাস বের করে সঠিক লোকেশন মিলিয়ে মিলিয়ে দেখে নিচ্ছেনঃ আমরা ঠিক দিশায় চলেছি তো? আমরা ঠিক দিশায় চলেছি তো?
আধা ঘন্টাটাক আগুপিছু আগুপিছু করে চলে চলে যেখানে গিয়ে ঠেকলাম আমরা সেটা কোনো স্তূপ-টূপ ছিল না, ছিল একটা পুরানো ধাঁচের বসতবাটি।
এ’ তো মানুষের থাকবার জায়গা। এইখানে কি বুদ্ধের দেহাবশেষ থাকতে পারে? কড়া নাড়িয়ে সেটি গৃহকর্তাকে জিজ্ঞাসা করাটা কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?
পুরনো বাড়ির গেটে কিন্তু আধুনিক কায়দায় একটি পিতলের নেমপ্লেট লাগানো রয়েছেঃ ‘এ. এন. শাক্য’ !
এ’ আবার কী নাম রে বাবা?!
‘ইয়েস!’ বলতে বলতে সেই প্রাচীন বাড়ির গেট খুলে আমাদের স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন যে বয়স্ক ব্যক্তি তাঁকে কয়েকদিন আগেই আমাদের বাড়ির সান্ধ্য আসরে দেখেছি আমরা, দাদু যাঁকে ‘রায়সাহেব’ বা, ‘বড়ে-ভাইয়া’ বলে সম্বোধন করছিলেন।
চুড়ান্ত অবাক হয়ে গেলাম আমরা।
ইনি কি এখানেই থাকেন? এতো দূরে? আমি তো ভেবেছিলাম গিরিডিতেই থাকেন উনি।
হয়ত আমাদের মনের প্রশ্ন পড়ে নিয়ে উনি নিজে থেকেই বললেন, ‘আপনাদিগকে আসতে দেখেছি আমি ছাদের উপর থেকেই। তাই তো নেমে এলাম স্বাগত জানাতে। আমি এখানেই থাকি, আমাদের এই আদিবাড়িতেই । মাঝে মাঝে মেজোভাইয়ের কাছে গিরিডিতে যাই। জজসাহেবকেও সেলাম বাজিয়ে আসি তখন।
এখন বলুন আপনারা গরম দুধ পীবেন, না চায় লিবেন? ’
বেশি কথা না বাড়িয়ে তাপসদাদা সরাসরি কাজের কথায় চলে এল।
‘রায়সাহেব, গ্রীক বলুন বা বৌদ্ধপদ্ধতি---আমার ভূগাণিতিক হিসাব বলছে বোধিসত্ত্বের একটি প্রধান রেলিক এখানেই কোথাও অবস্থিত রয়েছে, যার সন্ধানে বিগত দুই মাস কলকাতা থেকে এসে আমি পড়ে আছি এই অঞ্চলে, এবং নানান বইপত্র পড়ে চলেছি জজসাহেবের লাইব্রেরিতে । জোনাথন হার্পারের আবিষ্কৃত পুঁথিতেও এই গোপন বুদ্ধ-অবশেষের, মানে রেলিকের, উল্লেখ পেয়েছি। এখন, আপনি একজন বয়ঃজ্যেষ্ঠ মানুষ, আপনার কাছে জানতে প্রার্থনা করছি---বলুন, আমি কি ভুল না ঠিক? আশা করি, আপনি সত্য কথাই বলবেন, মিথ্যা বলবেন না। ’
‘প্রথমতঃ তো এই মূহুর্তে আপনারা আমার অতিথি, মেহমান। তার তো কোনো গ্রীক বা ভারতীয় ভার্সন নেই….’, হো হো করে হাসতে হাসতে বললেন সেই বয়ঃজ্যেষ্ঠ পুরুষ, ‘ আগে আসুন বসুন আপনি গরীবের এই নিলয়ে। সব বলব আপনাকে। লুকানোর মতো কিছু নেই, তেমন কিছু কাজও করিনি এতো বছরের মধ্যে, আমার এই দীর্ঘ জীবনে।
কি কি কি কি করে ডাকতে ডাকতে একদল বুনো হাঁস উড়ে চলে গেল পশ্চিমাকাশের দিকে, আমরা তখন রায়সাহেবের বৈঠকখানায় বসে ফার্স্টক্লাস দার্জিলিং টী উপভোগ করছি। বয়স কম ছিল তখন আমার, তবু হ্যাপি ভ্যালি দার্জিলিং টী-র সুবাসকে তারিফ করতে পারবো না তা তো নয়।
আজ থেকে আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে তাঁর শিষ্যদলের সম্মুখে বসে তথাগত বুদ্ধদেব যেদিন বলেছিলেন, চলো বৎসদল কুশীনগর গ্রামের উদ্দেশে, ---আমার চিরবিদায়ের কাল সমুপস্থিত, সেইখানেই হবে মহাপরিনির্বাণ---সে কথা শুনে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিলেন তাঁর শিষ্যদল।
আশি বছর বয়স তখন তাঁর হতে চলেছে প্রায়।
বিশেষ একজন শিষ্য বা সুহৃদকে উনি চেয়েছিলেন যার কাছে ওঁর কিছু গোপন তথ্য দিয়ে যেতে হবে।
প্রিয় শিষ্যবর্গের সক্কলেই এগিয়ে এসেছিলেন এ’কাজে যাঁর মধ্যে থেকে ‘আনন্দ্’-কে বেছে নেন উনি। তার কারণ ও গল্পও অনেক অনেক লেখা আছে বৌদ্ধসাহিত্যের পাতায় পাতায় , তত গল্পে কাজ নেই আমাদের এখন এখানে। কিন্তু এর মধ্যেই বুদ্ধদেবের আরেকজন শিষ্য সুগত-ও ছিলেন যিনি প্রভুর দ্বারা বিশেষভাবে নির্বাচিত না-হয়ে দুখী হয়ে পড়েন ও রোদন করতে শুরু করেন। ইনি নাকি বোধিসত্ত্বের এক দূরসম্পর্কীয় তুতো ভাই হতেন, ‘শাক্য’ বংশীয়।
প্রভু বলেছিলেন, দুখী হয়ো না হে প্রিয় ভ্রাতা সুগত আমার। তোমাকে আরেকটি বিশেষ কাজের দায়িত্ব আমি দিয়ে যেতে চাই। কঠিন সে কাজ। বল, তুমি কি পারবে তা সম্পন্ন করতে?
হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ ….প্রভু, আদেশ করেই দেখুন না আপনি এই অধম শিষ্যকে।
আমরা জানি, এই সময়ের প্রায় ষাট বৎসর আগে তরুণ এক রাজপুত্র কপিলাবস্তু প্রাসাদ ও স্ত্রীপুত্র-রাজ্যপাট পরিত্যাগ করে দক্ষিণদিকে পরিভ্রমণ শুরু করেছিলেন, এবং তার ছয় বৎসর পরে পুণ্যক্ষেত্র গয়াধামের নিরঞ্জনা নদীতীরে তাঁকে আমরা দেখতে পাই গোয়ালিনী সুজাতার রাঁধা পরমান্ন দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করছেন ও বাঁচাচ্ছেন নিজপ্রাণ। ততদিনে বোধিজ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি ।
এরপর বারাণসীর নিকট সারনাথে গিয়ে উনি শুরু করছেন ধম্মের প্রচার। তার আগে তো মার (অর্থাৎ, কামদেব ) এসে ভয় দেখিয়ে বা মোহের টানে বশ করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছে, কিন্তু গৌতমের প্রবল তপস্যা ভাঙতে পারেনি ।
এ’সবই জানা তথ্য।
কিন্তু গুরু কে ছিলেন গৌতমবুদ্ধদেবের?
কে তাঁকে শিখিয়েছিলেন সংযম, দেখিয়েছিলেন অহিংস সাধনমার্গের পথ?
গুরু ছাড়া কি সফল হতে পারে বিশ্বশ্রেষ্ঠ এক যুগপুরুষের তপস্যা?
এতো বড় বৌদ্ধশাস্ত্রের কোত্থাও লেখা নেই গো সেই কথা!
বোধিসত্ত্ব কহিলেন, হে প্রিয় শিষ্য সুগত আমার, আজ হতে ‘অকূর্চ’ নাম দিলাম আমি তোমার---অকূর্চ মানে সরল-তথা-জ্ঞানী । তুমি খুঁজে বের করো আমার গুরুকে, যাঁকে আমি পেয়েও হারিয়েছি । তুলে দিও তাঁর পায়ে আমার গুরুদক্ষিণা। তবেই পূর্ণ হবে আমার মনোবাঞ্ছা। ততদিন তোমারও নির্বাণ নাই!! ‘জাতক’ হয়ে তুমি জন্ম নিতে নিতে চলবে আগামী আগামী দিন-কাল-বৎসর-শতাব্দীর পথ ধরে ধরে, যতদিন না এ’ কর্তব্য সম্পাদন করতে পারছ। হয়তো আমার গুরুও শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে ‘জাতক’-এর মধ্যে দিয়ে জন্মে জন্মে চলতে থাকবেন এ’ পুণ্যভারতভূমের স্থানে স্থানে । কে জানে আসলে সত্যটা কী ঘটবে কবে ঘটবে আদৌ ঘটবে কিনা। আমি ঠিক জানি না।
তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি ?
এবার অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন বোধিসত্ত্ব, “আমার এই ভক্তশিষ্য আনন্দ্-ও নিজ কাজ সম্পন্ন করে এসে যোগ দেবে তোমার সাথে। সাহায্য করবে তোমায়। কী, পারবে তো তুমি এই কাজ সম্পন্ন করতে, অকূর্চনাথ?”
এই বলে তিনি রূপোর তৈরি একজোড়া মল তুলে দিলেন অকূর্চের হাতে! ‘মল’ কিন্তু নূপুর নয়, কিন্তু পায়ে পরার গহনা---মোটা বালা-র মতো।
এই সেই গুরুদক্ষিণা যা কিনা অকূর্চকে তুলে দিতে হবে গুরুর গুরুর হাতে। বা, পায়ে।
‘বাঃ! বাঃ! অভিভূত হলাম রায়সাহেব! অসাধারণ গল্প! অসাধারণ গল্প! কিন্তু এতো বড় বৌদ্ধসাহিত্যের মধ্যে কোত্থাও তো এ’গল্পের উল্লেখ পাইনি। ’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই আখ্যানটি শুনতে শুনতে তাপসদাদা বলেছিলেন সেদিন ওঁকে।
‘সবই কি ভাই তোমাদের সাদা-বা-হলুদ সাহেবদের লেখার মধ্যে থাকতে হবে ? কিছু তো এ’দিশি ওরাল হিস্ট্রির মধ্যেও থেকে যায় গো। ’
---‘তা বটে। তা বটে। আচ্ছা, স্যর, আপনার অনুমতি নিয়ে এই কাহিনি কি এক জার্নালে লিখে পাঠাতে পারি আমি?’ তাপসদাদার অনুনয়।
---‘স্ট্যানফোর্ডে?’ হাসলেন সেই রায়সাহেব, ‘কিন্তু ওরা তো প্রমাণ চাইবে। কী প্রমাণ দিবে তুমি ?’
অধোবদনে বসে রইল তাপসদাদা। এতো কাছে এসেও বোধহয় ‘আবিষ্কার’-টা হাতছাড়া হয়ে যায় যায় প্রমাণের অভাবে।
---‘তার চাইতে, এসেছ যখন, একটা রেলিক তো চাক্ষুষ করে যাও। না, কেশ বা নখের মতো কোনো শারীরিক অবশেষ তো দেখাতে পারবো না, কিন্তু পারিভোগিক অবশেষ একটা আছে, মানে বোধিদেবের স্পর্শ পাওয়া কন্থা বা ভিক্ষাপাত্র বা…’ বলতে বলতে পাশে দাঁড়ানো এক নেড়ামাথা ভৃত্যের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন উনি, ‘ভাই আনন্দ্, যাও না ভাই, দোতলায় গিয়ে দেরাজটা একবার খুলে দাও না। আমি ওঁদের নিয়ে আসছি। ’
এরপর সেই দোতলার কক্ষে উঠে যা দেখলাম ও শুনলাম আমরা তার না তো কোনো ব্যাখ্যা হয়, না কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থে তার হদিশ আছে। নিজচোখে না দেখলে ও শুনলে এটাকে গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত না।
অগ্রাহয়ণ মাসের এক দুপুরের প্রখর রৌদ্রালোকে বিহার প্রদেশের একটি নগণ্য গ্রামের বাড়ির দোতলায় পুরনো এক দেরাজ খুলে নীলরঙা এক কাসকেটের মধ্যে রূপোর একজোড়া মল আমাদের সামনে রাখলেন সেই বরিষ্ঠ ব্যক্তি, এ’বাড়ির গেটে যাঁর নাম ‘এ এন শাক্য’ লেখা রয়েছে ।
আমি তখন বালক মাত্র, তবু এর গুরুত্ব যে বুঝতে পারিনি তা নয়। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমাদের।
তাপসদাদা তো কেঁদে ফেলেছেন প্রায়, ‘এ…এ…এ কী দেখাচ্ছেন, স্যর, আমাদের ? এ-ই কি সেই মল যা কিনা ওঁর গুরুকে দেবার জন্যে রেখে গিয়েছিলেন সেই আলোকসামান্য পুরুষ? আপনার হাতে এলো কী করে এ’? ’
---‘বিগত আড়াই হাজার বছর ধরেই তো প্রচেষ্টায় আছি আমি ও আনন্দ্ এই নূপুরজোড়ার প্রকৃত অধিকারিণীকে খুঁজে বের করে তাঁর পায়ে সঁপে দিতে….। জাতকের গল্প তো কেবল পাস্ট পাস্ট পাস্ট নয় হে তাপসবাবু, ফিউচার ফিউচার ফিউচারও চলেছে, চলে চলেছে সমানে আজও, যার হদিশ তোমরা আজ আর রাখো না। কী বুঝলা বঙ্গালী বাবুসায়েব? কী মনে হয়, এই জন্মে বা জাতকের আগামী কোনো এক অবতারে কি খুঁজে পেয়ে যাবো না আমার গুরুর সেই গুরুকে?’
ফেরবার ট্রেন মিস্ করে গিরিডির বাড়ি ঢুকতে আমাদের অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল । সামনের বারান্দায় হানটান করছেন দেখলাম দাদু ও দিদিমা।
অতঃপর ডিনার শেষে আজকের গল্প ওঁদের করাতে দাদু গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘তোমরাও কি শেষটায় রায়বাহাদুরের জাতকের গল্প শুনে এসে ঘরে ফিরলে? এ’ তল্লাটে কে না জানে ওঁর এ’গল্প? আমাকে আগে জিজ্ঞেস করলে বলে দিতাম তোমাকে, হে তাপসবাবু। শর্টে এ. এন. শাক্য লেখেন বটে, কিন্তু ওঁর পুরো নাম হলো গিয়ে অকূর্চনাথ শাক্য, এটা জানো তো?
ভাবো!!
আর হ্যাঁ, দাদু-দিদার কাছে সব গল্প করলেও সেই রুপোর মল জোড়া দেখে আসবার কথাটা কিন্তু আমরা কেউই পাড়িনি। কারণ দাদু প্রথমেই এ. এন. শাক্য -এর গল্প এমন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন যে….
আর এটাও জানিনা, সেই মল-জোড়া আমরা সত্যিই সচক্ষে দেখে এসেছি জানলে অকূর্চনাথ মশায়ের প্রতি দাদুর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতো কি হতো না।
দীপঙ্কর চৌধুরী (জ. 1961) - শিশুসাহিত্যিক, গ্রন্থ-সমালোচক ও অনুবাদক ।
প্রকাশিত কিশোরগল্প-সংকলন::
ডাইনি ও অন্যান্য গল্প, মায়াতোরঙ্গ, এক্কা-দোক্কা, অপবাস্তব, নটে মিঞার গুপ্তধন (গ্রাফিক কিশোর-নভেল), কলোনিয়াল কলকাতার ফুটবলঃ স্বরূপের সন্ধান' (অনুবাদ)
লিখেছেন, লিখছেন পরবাস, জয়ঢাক, কিশোর ভারতী, টগবগ, চার নম্বর প্লাটফর্ম প্রভৃতি পত্রিকায়।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রাক্তনীদের মুখপত্র 'অটাম এনুয়াল' পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন আট বছর।
'পরবাস' পত্রিকার গ্রন্থ-সমালোচনার কলমটি লিখছেন গত পনের বছর ধরে একাদিক্রমে ; ছদ্মনামে।
কলিকাতা নিবাসী । হিন্দু স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী। পেশায় ছিলেন ব্যাঙ্কার, অধুনা সেবানিবৃত।
Read more reflections on life, art, and the human spirit from our contributors.
Join us in promoting cross-cultural dialogue, preserving heritage, and fostering global collaborations through art, literature, music, and festivals.