যে সুর বাজে মানব মাঝে - ১ (বিশ্বপট) | Arijit Choudhuri

পৃথিবীর আলোয় প্রেম

যে সুর বাজে মানব মাঝে - ১ (বিশ্বপট)

✍️ অরিজিৎ কথঞ্চিৎ

১৯০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রথম শিল্পের জগতে মোটর গাড়ি, এরোপ্লেন, এটম বোমের ধ্বংসলীলা, রাজনীতির জগতে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ, টাইপরাইটার থেকে থ্রি-ডি প্রিন্টিং, ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজম-এর প্রসার ও সঙ্কোচন, লীগ অফ নেশনস থেকে রাষ্ট্রসংঘের উত্থান এবং বিশ্বায়নের জিগির-এর মধ্যেই তাদের প্রভাবের হ্রাসপ্রাপ্তি, প্রযুক্তি-ক্ষেত্রে ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোনে জগৎ ভরে দেওয়া, রোবটিকস-এর হাত ধরে কৃত্রিম বুদ্ধির প্রসার এসব নিয়ে ভাবলে মানুষের উদ্ভাবনশক্তি আর ক্ষমতা নিয়ে আশা জাগে।

অন্য দিকে, অক্টোবরে গাজার যুদ্ধও দু’বছরে পা দেবে। গাজায় দুর্ভিক্ষও শুরু হয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। দেশে মণিপুরের অশান্তি চলছে আড়াই বছর। আমেরিকা- রাশিয়ার ঠাণ্ডা লড়াই থেমেছে ঠিকই, কিন্তু শেষ দেখা যাচ্ছে না উক্রেন-এ প্রায় তিন বছর ধরে চলা ভয়ঙ্কর যুদ্ধের। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া সহ সাবেক সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলির এক বিশাল অংশে একনায়কতন্ত্রের রমরমা, ভারতে কাঁওয়ারিয়া নামের এক তীর্থযাত্রীদল পাতে পেঁয়াজ দেখলে লাল কাপড় দেখা ষাঁড়ের মত ভেঙ্গে দিচ্ছে দোকানপাট। আফগানিস্তানে মেয়েদের ভূমিকম্পের উদ্ধারকাজে নেওয়া হয় নি, সম্পূর্ণ পুরুষ দল ধর্মীয় রেওয়াজ মেনে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে শুধু পুরুষদের উদ্ধার করে ধর্মান্ধ, নিষ্ঠুর নীতিবিচারের আরও এক অন্ধকার জগৎ উন্মোচিত করছে। পৃথিবীর যে বিশাল সংখ্যক লোক মৃত্যুর আগে ইহলোকের বাস্তব সমস্যাকে ভুলে পরলোকের ভালো-মন্দের ভাবনায় ডুবে আছে, তারা পিটুনি খেয়ে চুপ করে থাকতে রাজি, কিন্তু আবেগে আঘাত লাগলেই ধুন্ধুমার। যখন বিশাল প্রকৃতিকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলার স্বপ্ন দেখছে মানুষ, তখনই অদৃশ্য অতি ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস এসে প্রচুর লোক মেরে সন্ত্রস্ত প্রায় আট কোটিকে দু’বছর ধরে ঘরবন্দী করে স্বপ্নভঙ্গ করে চলে গেল। আরও দেখুন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যে দেশগুলি স্বাধীন হয়েছে (বিশেষতঃ আফ্রিকায়), তারা কিছুতেই পশ্চিমী দুনিয়া বা চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বা অতি দারিদ্র্যের শিকল ভেঙ্গে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। এসব দেখে শুনে বিশ্ব তথা ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়া স্বাভাবিক।

আমাদের ছোট ছোট জগতে চোখের সামনে ধরা পয়সা বৃহৎ জগতের সূর্যকে আড়াল করে রাখতে পারে। তাৎক্ষণিক আশার উচ্ছ্বাসে উড়তে থাকা বা তার বিপরীত অনুভূতি হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এড়িয়ে বাস্তব জগতে থাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদী তথ্য দেখা প্রয়োজন। আগেকার দিনে মানুষের পাখীর মতন-খাওয়া আর মাথা গোঁজার জায়গা পেলেই চলত, কিন্তু পূর্ণেন্দু পত্রীর ভাষায় এখনকার মানুষের ‘৩৬ রকম বায়নাক্কা’ আর ‘৫২ রকম উবু-জ্বলন্ত খিদে’।

সম্ভবতঃ এখনকার মানুষের বিবিধ প্রয়োজনের প্রাথমিক তালিকাটি দাঁড়াবে অনেকটা এই রকম-

  • জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
  • খাদ্য
  • বস্ত্র
  • বাসস্থান
  • বাস্থ্য
  • শিক্ষা
  • ইন্টারনেট সুবিধা
  • গণতন্ত্রের প্রসার
  • সমৃদ্ধি

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ

১৭৯৮ সালে ব্রিটেনে অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাস প্রিন্সিপল অফ পপুলেশন নামে বাস্তব তথ্যভিত্তিক একটি প্রবন্ধে লেখেন, খাদ্য উৎপাদনের চেয়ে বেশি হারে জনসংখ্যা বাড়বে, তার ফলে মারামারি, যুদ্ধ ইত্যাদি শুরু হবে। সেই তত্ত্বের প্রেমে পড়েছিল সারা পৃথিবীর লোক- সে প্রেম আজও অমলিন। এখনও ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের যে কোন দেশে খাদ্য, শিক্ষা, অপরাধপ্রবণতা এমন কি অপরিচ্ছন্নতার জন্যও জনসংখ্যাকেই দায়ী করে আমরা চিন্তামুক্ত হই।

সময় আর বিজ্ঞান ম্যালথাস সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রতিপন্ন করেই ক্ষান্ত হয় নি। জন্মহার কমে গিয়ে ব্যাপারটি এমন উলটে গিয়েছে যে বিশ্বের অতি গরীব দেশগুলি বাদ দিলে সর্বত্র ভয় এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে জনসংখ্যা হ্রাসের। ভারতের ক্ষেত্রেও প্রধানতঃ হিন্দি বলয়ের অপেক্ষাকৃত গরীব অঞ্চলগুলি আর মণিপুর, মেঘালয় বাদ দিলে সর্বত্র জন্মহার প্রতিস্থাপন হার, মহিলাপ্রতি ২.১ সন্তানের নীচে চলে গিয়েছে।

blog Image

‘মরা’ ‘মরা’ বলতে বলতে করি যে রামের নাম, লোক বাড়ার ভয় পেতে পেতে লোক কমছে দেখিলাম। ছবি ১- পৃথিবীর সর্বত্র গড়ে মহিলা প্রতি সন্তানজন্ম কমছে। জনসংকোচন এড়াতে প্রতি মহিলার অন্ততঃ দু’টি (২.১) সন্তান, অর্থাৎ প্রতি দশজন মহিলার ২১টি সন্তান হওয়া প্রয়োজন। একটি বেশী রাখার কারণ অনিবার্য শিশুমৃত্যু।


blog Image

ছবি ২- এশিয়ার কয়েকটি মাত্র ও আফ্রিকার বেশীরভাগ দেশ বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই জাতিধর্ম নির্বিশেষে মহিলাপ্রতি সন্তান প্রতিস্থাপন সংখ্যা ২.১ এর নীচে নেমে গিয়েছে।

উঁচু জন্মহার বিশিষ্ট প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে দুটি মুসলমান প্রধান-নাইজার (৮১%-১) ও মালি (৯২%), তিনটি খৃষ্টান প্রধান-অ্যাঙ্গোলা (৭৫%), ডি আর কঙ্গো (৮০%) বেনিন (৪৩%- মুসলমান ২৪%)

ধর্মে আলাদা হলেও এদের মিল ভৌগোলিক অবস্থান (দরিদ্রতম মহাদেশ আফ্রিকায়) আর তীব্র দারিদ্র্যে। এশিয়ার যে কয়েকটি দেশে জন্মহার বেশী, যেমন পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মঙ্গোলিয়া- তারাও গরীব।

জন্মহার নীচে চলে যাওয়ায় পৃথিবীর সম্পন্ন এলাকাগুলি এখন জনসংকোচনের আশংকায় কম্পমান। এর ছাপ যুদ্ধেও পড়েছে। রাশিয়ার জন্মহার ১.৫২, তাই তারা জোর করে উক্রেন থেকে প্রায় কুড়ি হাজার বাচ্চা নিয়ে গেছে তাদের রাশিয়ান হিসেবে বড় করার জন্য। দুঃখের কথা হ’ল উক্রেনের জন্মহার রাশিয়ারও নীচে (১.২২)।


খাদ্য

খাদ্য উৎপাদন জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিতে পারবে না। ম্যালথাস তত্ত্ব বলে, খাদ্য নিয়ে দাঙ্গা আর দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়।


blog Image

ছবি ৩- ম্যালথাস তত্ত্বের সারাৎসার। এরকম বহু তথাকথিত ভবিষ্যদ্বাণী যে ব্যর্থ হয়ে যায় তার কারণ মানুষের ভবিষ্যতের ঠিকানা অতীতের অভিজ্ঞতা নির্ভর। প্রতিভা যতই থাক না কেন, মানুষের ভবিষ্যৎ উদ্ভাবন আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব। প্রথম কমার্শিয়াল মোবাইল ফোন (১৯৪৯) শুধু কথা বলার জন্যই তৈরি হয়েছিল। তার ৪৫ বছর পরে ১৯৯৪ এ প্রথম স্মার্টফোন বাজারে এলো আর তাকে ব্যবহার করে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ- ছবি তোলা, ব্যবসা, পড়াশোনা, ব্যাঙ্কিং, খেলা বা সিনেমা দেখা অথবা কোন অচেনা জায়গায় ঠিকানা খুঁজে বার করাও সম্ভব হবে তা কে-ই বা আন্দাজ করতে পেরেছিল।

খেতে পাবে না- ভয় দেখালেন পণ্ডিত ম্যালথাস,
তুড়ি মেরে ওড়ালো সে ভয় নতুন যুগের চাষ।

ম্যালথাসের আতঙ্কজনক ভবিষ্যদ্বাণীর প্রায় দু’শ পঁচিশ বছর পর বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ও জনসংখ্যার চেহারা দাঁড়িয়েছে এই রকম।


blog Image

ছবি ৪- জমির উৎপাদনশীলতা ক্রমবর্ধমান। জনসংখ্যা বাড়লেও বিজ্ঞানের কল্যাণে খাদ্যের যোগান তার সাথে পাল্লা দিয়ে, তাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। চাষের জন্য নতুন জমির প্রয়োজন হচ্ছে না আর। ছবিটিতে আর যে কথাটি জড়িয়ে আছে তা হল ১৯৬১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যত বাড়িঘর, রাস্তা, কলকারখানা, স্কুলকলেজ বা হাসপাতাল তৈরি হয়েছে, কৃষিবিজ্ঞানীদের সহায়তা ছাড়া তাদের জন্য জমি পাওয়া কঠিন হ’ত ।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের রিপোর্ট অনুযায়ী চাষের জন্য জমির প্রয়োজন এই শতাব্দীর প্রথম দিকে তার চূড়ায় পৌঁছলেও পরবর্তীকালে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে সে পরিমাণ ক্রমাগত কমে আসছে। আর সে জমিগুলি দখল করছে ঘাস, জংলি ঝোপঝাড় ও নিজের থেকে গজিয়ে ওঠা গাছপালা।


বস্ত্র


blog Image

ছবি ৫- প্রাচুর্যের আর একটি প্রমাণ বস্ত্র উৎপাদনে। পাশের ছবিতে বেগুনি এবং কমলা লাইন দুটি দেখাচ্ছে ২০০০ সাল থেকে ২০১৫-র মধ্যে পোষাক উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে, মানুষের সংখ্যা বেড়েছে দেড়গুণের কাছাকাছি। এর ফলশ্রুতি স্বরূপ মানুষ পোষাক বদলাচ্ছে আগের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি অর্থাৎ একই পোষাকের ব্যবহার কমে আসছে (তুঁতে রঙের লাইন)


ছবি ৬- ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে পোষাক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে পলিয়েস্টারের উৎপাদনের লক্ষ্যণীয় বৃদ্ধি শুধু কাপড়ের যোগান বাড়িয়ে প্রকৃতিনির্ভর তুলোচাষের অনিশ্চয়তা থেকে মানুষকে অনেকটাই মুক্ত করেছে।

blog Image

বাসস্থান

বিশ্বময় বাসস্থানের বৃদ্ধি ঘটার গাণিতিক, নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া না গেলেও চাষের জন্য জমির প্রয়োজন ক্রমাগত কমে আসা, বহুতল ফ্ল্যাট এবং আধুনিক মানুষের সন্তান উৎপাদনে অনীহা ও অসুবিধার কারণে বাসের জন্য জমি এমন কি খালি বাড়ির সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। রিয়াল এস্টেটের ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম ভাবে বাড়ির দাম বাড়াতে থাকলেও সাধারণ বুদ্ধি বলে, জনসংখ্যার বৃদ্ধিহার কমে যাওয়ার প্রেক্ষিতে গড় হিসেবে বাড়ির চাহিদা তেমন বাড়তে পারে না। নানা অপ্রত্যক্ষ প্রতিফলন আছে। অষ্ট্রেলিয়াতে অভিবাসী এক যুবকের কাছে শুনলাম বাড়ি কেনার জন্য সেখানকার সরকার তাকে দিয়েছে ৫০০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা)। জাপানে ২০২৪ সালেই প্রায় ৯০ লক্ষ খালি বাড়ি ছিল। এখন ইন্টারনেট-এ আকিয়া হাউস (Akiya house) টাইপ করলেই অসংখ্য বিনামূল্যের জাপানি বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্য

মানুষের আয়ু ও সুস্থতার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান যা করেছে তাকে বিপ্লব বললে কম বলা হয়।

১৯২৫ সালে পৃথিবীর মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩০ বছরেরও কম, এখন সেটি ৭০ বছরের বেশি।

blog Image

ছবি ৭- অনেক মানুষের বাসনা পুনর্জন্মের। বৈজ্ঞানিকরা সে বিষয়ে কিছু না বলে শুধু গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আয়ু বাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি করে দেওয়ায় পুনর্জন্ম ঠিক না হলেও গড়পড়তায় মানুষের এই জীবনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন আর একটি জীবৎকাল।

স্বাস্থ্য চেয়ে পেয়ে গেলে একটি জীবন আরো
বিজ্ঞানের জোরে কোনো দিন অমর-ও হতে পারো।


blog Image


ছবি ৮ (উপরে)- ১৯০০ সালে সুইডেন-এর মত অতি উন্নত দেশেও প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে একটি পাঁচ বছরে পা দেবার আগেই মারা যেত, এখন সেই হারটি শূন্যের কাছাকাছি।

ছবি ৯ (পাশে)- ১৯৮৫ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে উন্নতিশীল এশিয়ায় সদ্যপ্রসবিনী মায়েদের মৃত্যুহারও কমে নেমে গেছে অর্ধেকেরও নীচে।

blog Image

blog Image

ছবি ১০- ১৯৫০ সালে প্রতি ১০০ জন কিশোরের মধ্যে ২৭ জন ১৬ বছর হবার আগেই মারা যেত (২৭%)। এখন সেই সংখ্যাটি কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৪ জন। এসব উন্নতি শুধু মৃত্যুহার কমায় নি, বাড়িয়েছে জীবনযাপনের নিশ্চিন্ততা ও আনন্দ।



blog Image blog Image

ছবি ১১ ও ১২- দারিদ্র্য যে কত বড় অভিশাপ তা আফ্রিকানদের চেয়ে বেশি হয়তো কেউ বোঝে নি। গরীব বলেই তাদের সন্তান মারা যায় অনেক বেশী সংখ্যায় আর সে জন্যই ‘অন্ততঃ একটি তো বাঁচবে’ ভাবনার ভিত্তিতে তাদের বাচ্চা হয়ও বেশি। এ ছাড়াও ‘রুটি কিনব, না জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী?’ এ দ্বন্দ্বটিও গরীব মানুষের পিছু ছাড়তে চায় না।


শিক্ষা

blog Image

ছবি ১৩- শিক্ষা আধুনিকতার, উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার। ১৯০০ সালে শতকরা মাত্র ২০ জন লিখতে পড়তে পারতেন। ভারত সহ আফ্রিকার দেশগুলির তখনকার তথ্যের অনুপস্থিতিতে সার্বিক বিশ্বময় নিরক্ষরতার হার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল এমন ভাবা অন্যায় হবে না। এখানেও ছবিটি উল্টে গিয়ে সাক্ষর মানুষের সংখ্যা ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

পেশীর চেয়ে মগজ বেশী শক্তি ধরে আজ,
শিক্ষা-বিহীন কষ্টে বাঁচে, পায় না ভালো কাজ।


ছছবি ১৪- শিশুরা শুধু আনন্দের উৎস নয়, অনুন্নত জায়গায় তারা রোজগারের হাতও বটে। অনেক সময়ই গরীব অভিভাবক শিশুদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কোন অর্থকরী কাজে লাগিয়ে দেন। এই ছবিটি আফ্রিকা ও এশিয়ার তথ্যবিহনে অসম্পূর্ণ। তবুও বাচ্চাদের স্কুলে থাকার সময়ের দৈর্ঘ্যের ক্রমোন্নতি দেশ ও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ।

blog Image

blog Image

ছবি ১৫- ইন্টারনেট পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলিতে শিক্ষাবিস্তারের, তার গণতন্ত্রীকরণের একটি আধুনিক, কার্যকরী হাতিয়ার। একটি গ্রামে বসে সোলার প্যানেলে তৈরি বিদ্যুৎ আর সেকেন্ড হ্যান্ড কম্পিউটার নিয়ে বসে নিজের পছন্দসই বিষয়ের ওপর বিশ্বের প্রথম সারির পণ্ডিতদের বক্তৃতা শোনা ও শেখা সম্ভব। এমন কি ইউটিউব ভিডিও দেখে নানা হাতের কাজ, গাড়ি বা অন্য যন্ত্রপাতি সারানোর অনেক সহায়তা পাওয়া যায় যা চিন্তার অতীত ছিল।

এই অতি কার্যকর উপায়টি ৩০ বছরের মধ্যে শূন্য থেকে ৬৮ শতাংশ মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া ম্যাজিক ছাড়া আর কি? তবে, এই ৬৮ শতাংশ এসেছে মূলতঃ ধনীদের থেকে। সম্পন্ন দেশগুলির ৯৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, গরীব দেশগুলিতে তেমন নাগরিক মাত্র ২৭ শতাংশ।


<গণতন্ত্রের প্রসার

রাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ মানুষের পক্ষে ভালো। গণতন্ত্র স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা তুলে ধরে তাদের সমাধানের পথ প্রশস্ত করে, অন্ততঃ শাসকদের সে বিষয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে। অবিচারকে মাত্রাছাড়া হতে বাধা দেয়।

blog Image

ছবি ১৬- নিখুঁত হোক বা ত্রুটিপূর্ণ- এখন গণতন্ত্র বিশ্বের দেশগুলির প্রধান চালিকাশক্তি।

১৮১৬ সালে আমেরিকা আর কয়েকটি ছোট দেশ ছাড়া কোথাও গণতান্ত্রিক শাসন ছিল না। এখন সে ব্যবস্থাটিই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অর্ধেকের ওপর দেশে কোন না কোন ধরণের গণতন্ত্র বহাল। গণতন্ত্রের প্রসার আর সবুজ বিপ্লব একসাথে দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে এনেছে। নীচে দেখুন বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে দুর্ভিক্ষ ঘটানোয় প্রকৃতির প্রভাব কীভাবে কমে আসছে।

ছবি ১৭- পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষএখন গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে বাস করেন।

ছবি ১৮- দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর হার ক্রমহ্রাসমান। ১৯৬০ এর দশকে সবুজ বিপ্লব সেটিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।


blog Image blog Image

সমৃদ্ধি

অবিচার থাকলেও, নানা ধরণের শাসন, বেতন, বণ্টনব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বা চিকিৎসার অব্যবস্থা সত্ত্বেও গত দুই শতাব্দী সাধারণ মানুষের উত্তরোত্তর দারিদ্র্য, থেকে মুক্তির ইতিহাস।


blog Image

ছবি ১৯- ১৯৫০ থেকে এখন পর্যন্ত তীব্র দারিদ্র্যপীড়িত (দিনযাপনের খরচ ৩ ডলারের নীচে) মানুষের সংখ্যা শতকরা ৫৯ জন থেকে ৯ জন-এ নেমে এসেছে।


ছবি ২০- খুশির কথা হ’ল শুধু অতি দরিদ্র নন, নানা স্তরে বেড়েছে মানুষের বাস্তব আয় (মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কাটিয়ে)।

blog Image

আর্থ-সামাজিক অসাম্য

পৃথিবীতে গড়পড়তা মানুষের অবস্থা উন্নতির দিকে গেলেও অসাম্য বাড়ছে, তার জন্য বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা।

blog Image

ছবি ২১- বাঁ দিকের ম্যাপটিতে দেখুন-আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা আর এশিয়ার যে দেশগুলিতে অসাম্য লক্ষ্যণীয় রকম বেশী, সেখানেই আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা ও উন্নতির অভাব।


২২- ডান দিকের ছবিটি দেখায় যেখানে অসাম্য বেশী, ক্ষুধার পীড়নও বেশী হওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই।

blog Image


blog Image

ছবি ২৩- পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার হাতে আসে মোট বৈশ্বিক আয়ের ৮ শতাংশ। তাঁদের বিপরীত মেরুতে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের উপার্জন মোট বৈশ্বিক আয়ের ১৮ শতাংশ। সম্পদের হিসেবে অসাম্য আরও প্রকট- ঐ দুই গোষ্ঠীর হাতে আছে যথাক্রমে ২ শতাংশ আর ৩৮ শতাংশ সম্পদ। গরীবের আয় দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতেই শেষ হয়ে যায় বলে তাদের হাতে সম্পদ জমে না। পিতৃপুরুষের সম্পদ বংশধরদের হাতে যায়। ধনীর সন্তান ধনী হয়েই জন্মায় ও তার আয় প্রথম থেকেই উদ্‌বৃত্ব হয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদকে স্ফীত করে অসাম্য তীব্রতর করতে থাকে।


blog Image

ছবি ২৪- ১৯৯০ এর দশকে সমাজতন্ত্রের পতনের সাথে সাথে দেশের অসাম্য বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। একই সময় পরিসরে আন্তর্জাতিক স্তরে অসাম্য কম হওয়ার কারণ সম্ভবতঃ বিশ্বায়ন ও ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য (T10-Top10; B50-Bottom 50)।


গুমোট ঘরে ভয়ের মাঝে

সবকিছু ঠিকঠাক চলছে এমন বলা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। নানা ধরণের ভয় এমন চেপে ধরেছে যে অনেক তরুণ বয়সী সম্ভাব্য মা-বাবা আর তাদের বিশ্বাসে ’নিশ্চিৎ সর্বনাশের মুখোমুখি এই পৃথিবীতে সন্তান আনতে না চেয়ে নানা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। যেমন, পৃথিবীতে সবচেয়ে কম জন্মহার বিশিষ্ট দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার শুধুমাত্র মেয়েদের ফোর বি (4B) সংগঠন, যার সদস্যরা নো ডেট, নো সেক্স, নো ম্যারেজ, নো চিলড্রেন -এই চারটি শপথে ঐক্যবদ্ধ। আর জার্মানিতে যুবক-যুবতী বিয়ে বা সন্তানজন্মের আগেই নিজেদের স্টেরিলাইজ করে নিচ্ছেন। এই সব অত্যাধুনিক গজিয়ে ওঠা ভীতির সাথে পুরনো ভয় যেমন, সাধারণ প্রদূষণ পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের সাথে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা, কৃত্রিম বুদ্ধিবিশিষ্ট যন্ত্রের হাতে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ চলে যাবার ভয়, প্যালেস্টাইন বা উক্রেন যুদ্ধের বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হবার আতঙ্ক জুড়ে যে সার্বিক দম- বন্ধ করা মনের ঘর- এ লেখার উদ্দেশ্য তার দেওয়ালে খোলা হাওয়া ঢোকার রাস্তা, একটি জানলা বসিয়ে দেওয়া।

blog Image

ছবি ২৫- গত শতাব্দীর চিত্র। প্রকৃতিকে অনটনসৃষ্টির দায় থেকে মুক্ত করে মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে চলেছে নতুন যুগের দুর্ভিক্ষ।


দুঃখের এই জগৎটিতে ভালোও আছে কতো, ফুটে ওঠে তথ্যে তারা একটি গানের মতো।

তবুও তথ্য বলছে নানা ধরণের রাজনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার আঁকাবাঁকা পথে চলতে হলেও মানবসমাজ উত্তরোত্তর উন্নতি করে চলেছে। সোচ্চার রাজনীতিক প্রচার তুলনামুলকভাবে ক্ষণস্থায়ী হলেও আমাদের প্রায় সব মনোযোগ টেনে নেয়। তার বাইরে ল্যাবরেটরিতে, পরীক্ষাগার করে নেওয়া মাঠে-ঘাটে হাসপাতালে নিশ্চুপে যা ঘটে যায়, যেমন উন্নত কৃষি বা চিকিৎসাপ্রণালী, সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, ইন্টারনেট ইত্যাদি- তাদের ফল সুদূরপ্রসারী, বার বার তাদের ইতিবাচক প্রভাব বাকি সমস্ত নেতিবাচক প্রভাবকে ছাপিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধিৎসু, তাঁরা বার বার নতুন প্রশ্ন তোলেন, আর এই প্রশ্ন করার জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন সেটিকে সৃষ্টি করে টিকিয়ে রাখেন সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, আইনবিদ ইত্যাদিরা। পরিবেশ রক্ষার জন্যই তৈরি হয় সংবিধান ও বিচারব্যবস্থা। আর তাই মানবতা মাঝে মাঝে রাজনীতিকদের ভুল নীতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা এইডস, করোনা ধরণের অতিমারীর প্রকোপে পিছিয়ে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়ায়, এগিয়ে যায়। এ কথা নিশ্চিত যে আগে কখনোও এত ভাল ছিলাম না এখন যেমন আছি। সমস্যা সব সময় থাকে, এখনও আছে। অতীতের বহু সমস্যার মত মানুষ আজকের দেখা এবং ভবিষ্যতের অদেখা সমস্যাগুলিরও সমাধান করে উঠতে পারবে এমন আশা ভিত্তিহীন নয়।

১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ | -অরিজিৎ চৌধুরী


তথ্যসূত্র-

About the Author:

Arijit Choudhuri, located in Navi Mumbai, petroleum geologist by profession. Also interested in issues concerning pollution, climate change and fast depleting groundwater reserves.Travelling, reading, writing articles, composing rhymes and recitation are his hobbies



Comments & Related Stories

Explore more tales of imagination, emotion, and human connection beyond the stars.

Ganga Zuari International: Connecting Cultures Across the Globe

Join us in promoting cross-cultural dialogue, preserving heritage, and fostering global collaborations through art, literature, music, and festivals.

Latest Events View Activities
Blog - Mélange Read Articles