ভূত-সংক্রান্ত রিসার্চ ও একটি প্রেমের গল্প | সম্বিত বসু

Poem Illustration

ভূত-সংক্রান্ত রিসার্চ ও একটি প্রেমের গল্প

✍️ সম্বিত বসু

নিশিরাত ব্যাঁকা চাঁদ ফ্যাকাশে।
নাকিসুরে গান গায় একা সে, একা সে।

আমার নাম সাগর। আর গানটা যে গাইছে তার নাম মধুরিমা। গান নয়, গানের প্যারোডি। আসলে গান গাইছিলাম আমি। শচীন কর্তার "ঘুম ভুলেছি নিঝুম"। আমি গান গাইলেই মধুরিমা উল্টোদিকের বারন্দা থেকে এরকম সব প্যারোডি গাইবে। বা কবিতা আওড়াবে। এই তো কদিন আগে গলা খুলে গাইছিলাম 'কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা'। মধুরিমা টোন কাটল -

আহা যদি থাকত তোমার
ল্যাজের উপর ডানা
উড়ে গেলেই আপদ যেত-
করত না কেউ মানা!

আমি থাকি সিঙ্গিদের বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে। আরও কজনের সঙ্গে মেস করে। মধুরিমা থাকে উল্টোদিকে মল্লিকদের বাড়িতে। মাঝে একটা চিলতে কানা গলি। গলির শেষে করবাবুর গ্যারেজ আর একটা বিরাট নিমগাছ। মধুরিমাদের বাড়িটা পেল্লায়। মধুরিমার দাদুর বাবা নন্দদুলাল মল্লিক ছিলেন স্বর্ণকার। পরিণত বয়সে দুই ছেলের সঙ্গে বউবাজারে দোকান খোলেন মল্লিক জুয়েলার্স অ্যান্ড সন্স। আগে বাঁধা ঘর ছিল, সেখানে ঘুরে ঘুরে ব্যবসা জোগাড় করতেন। পুরনো আমলে সেটাই ছিল দস্তুর। গেরস্তরা দোকানে এসে গয়না গড়াতেন না। বাঁধা স্যাকরা থাকত। পালা-পার্বণে ডাক পড়ত। দোকান খোলার পরে নদু মল্লিকের পসার খুব বেড়ে যায়। শেষ বয়সে পটলডাঙায় বিরাট অট্টালিকা হাঁকিয়ে সপরিবারে চলে আসেন। সেই বাড়িতে এখনও চার পুরুষ ধরে বাস করছে।

আমি মফস্বলের ছেলে। ভাল রেজাল্ট করে ফিজিক্স পড়তে কলকাতা এসেছিলাম। সায়েন্স কলেজে কয়েকবছর ঘষটে পিএইচডি শেষ করে ইউজিসির জুনিয়ার সায়েন্টিস্ট হয়ে সেই সায়েন্স কলেজেই বহাল হলাম। কাজ ছিল হাই এনার্জি পার্টিকল ফিজিক্স নিয়ে। আমার এক সিনিয়র, অরুণাংশুদা, পার্ট টাইমে পড়াবার চাকরি পেয়েছিল প্রেসিডেন্সিতে। আমাকে মাঝে মাঝে প্রেসিডেন্সি যেতে হত অরুণাংশুদার সঙ্গে দেখা করতে। একসঙ্গে একটা কাজ করছিলাম। সেখানেই একদিন মধুরিমার সঙ্গে দেখা হল। দেখা হল বলাটা ঠিক নয়, দেখা পেলাম বলাই হয়ত ঠিক। কারণ আমার মতন মফস্বলের অকিঞ্চিৎকর ছেলে কী করে মধুরিমার চোখে পড়বে! পোর্টিকোতে এক দঙ্গল বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারছিল। ভিড়ের মাঝেও ওর উজ্জ্বল উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়েছিল।

আমার সরকারী কাজের বাইরে আমি আরেকটা কাজ করছিলাম, গোপনে। সেটা হল ভূত নিয়ে রিসার্চ। গোপনে, কারণ আমি, একজন পার্টিকল ফিজিক্সের স্কলার, ভূতপ্রেত নিয়ে গবেষণা করছি জানতে পারলে হয়ত আমার জুনিয়ার সায়েন্টিস্টের চাকরিটাই চলে যাবে। এদেশে ভূত নিয়ে কোনরকম সত্যিকারের রিসার্চ হয়েছে বলে শুনিনি। রিসার্চে নেবে পেপার-টেপার ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম টুকটাক কাজ অবশ্য হয়েছে। অনেকদিন আগে আয়েঙ্গার বলে এক ভদ্রলোক সাউথে এ নিয়ে কাজ করেছিলেন। মেহেতা অ্যান্ড রুংতা বলেও দুজনের নাম পেয়েছি। একটাই পেপার যদিও। বাঙালিদের কোন গবেষণা চোখে পড়েনি ভূত নিয়ে। বলছি বটে ভূত, আমি রিসার্চ করছিলাম, যাকে বলে, হায়ার লেভেল অফ বিইং, তাই নিয়ে। ভূত হতে পারে, ভগবান হতে পারে - যে যেমন নামে ডাকবে। থিওলজির বই পড়ে দেখলাম অনেকেই বলেছেন, ভগবান মানে হায়ার এনার্জি। এই এনার্জি আর ফিজিক্সের এনার্জি এক নয় এটা বুঝতেই সময় চলে গেল। তারপরে ভাবলাম যদি এক হয়? সেখান থেকেই আমার গবেষণা শুরু।

আমার ভূতের রিসার্চের কথা অরুণাংশুদা জানত। প্রশ্রয়ও দিত। একদিন প্রেসিডেন্সিতে যেতেই আমাকে বলল, "চল তোকে পিকেবির কাছে নিয়ে যাই।" পিকেবি মানে প্রশান্ত কুমার ভট্টাচার্য। দর্শনের প্রফেসর। ভূতপ্রেত সম্বন্ধে দারুণ উৎসাহ। একটা প্রেতচর্চাচক্র চালান। প্রায় আড়াইশো জন তার মেম্বার। 'ওসব প্ল্যানচেট নয়, রীতিমত বৈজ্ঞানিক আলোচনা।' আমাকে বললেন, "একদিন আমাদের সোসাইটিতে তোমার গবেষণা নিয়ে সিম্পল একটা বক্তৃতা দাও না হে।"। থিওসফিকাল সোসাইটির একটা বড় হলঘরে একদিন সন্ধ্যেবেলা হাজির হয়ে গেলাম। আমি আর জনা চল্লিশেক ভূতপ্রেমী লোক। বললাম, আমার মনে হয় ভূত আসলে একটা ফ্রিকুয়েন্সি স্পেক্ট্রামের এনার্জি। এবং সেই স্পেক্ট্রামটা আমাদের এখনকার সাধারণ স্পেক্ট্রোমিটার দিয়ে ধরা যায় না। ওই স্পেক্ট্রামটাই যাকে আমরা ভূতলোক বলি। কোনভাবে যদি আমরা ওই স্পেক্ট্রামের সিগনাল ধরতে পারি, দেখব প্রচুর ভূত। তারা তাদের ভৌতিক জীবন যাপন করছে, মানুষের মতন পরস্পরের সঙ্গে মত বিনিময় করছে। হয়ত ঝগড়াঝাঁটি, প্রেম-বন্ধুত্বও করছে।

একজন জিগেস করলেন, যদি ধরাই না যায়, তাহলে এই যে এত লোকে বলে তারা ভূত দেখেছে, সেটা কী করে সম্ভব। আমার কাছে তার একটা চলনসই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল। সাপ যেরকম খোলস ছাড়ে, সেরকম ভূত অনেকটা এনার্জি ত্যাগ করে, নীচের ফ্রিকুয়েন্সি রেঞ্জে কিছুক্ষণের জন্যে আসতে পারে। যদিও সেটা যথেষ্ট নীচু নয়, তাই তাদের ঝাপসা মতন দেখায়, কথা খোনা শোনায় - কারণ নীচু হলেও মানুষের অডিবল ফ্রিকুয়েন্সি রেঞ্জের একদম ওপরের দিকে। কিন্তু সেই নীচের এনার্জি লেভেলে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। একজন প্রশ্ন করলেন, তাহলে মানুষের আত্মার কী হয়। আত্মা যে বৈজ্ঞানিক দিকে দিয়ে কী, সে সম্বন্ধে আমি কোন ধারণা করতে পারিনি। কিন্তু আলোচনা এইখানে পুরো বেলাইনে চলে গেল। আত্মা, ব্রহ্ম, ভারতীয় দর্শন, কান্ট, হেগেল ইত্যাদি নিয়ে প্রায় হাতাহাতি। আমি হুব্বার মতন দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘন্টাখানেক পরে পিকেবি সভা শেষ ঘোষণা করলেন। পরে জানলাম প্রেতচর্চাচক্রে বিজ্ঞানের লোক একজন মাত্র আছেন। কিন্তু তিনি থাকেন আসামের লামডিঙে। কাজেই আমার এই শেষ প্রেতচর্চাচক্রে যোগদান।

তার আর প্রয়োজনও ছিলনা। চেষ্টা না করতেই আসল কাজ হয়ে গেছিল। প্রেতচর্চাচক্র চলত মূলতঃ যাঁর বদান্যতায় তাঁর নাম মুকুন্দলাল মল্লিক। মল্লিক জুয়েলার্সের মালিক। আমার বক্তৃতার পরে আমাকে ডেকে পাঠালেন বাড়িতে। বয়স্ক লোক। আমার ভূতের রিসার্চ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব প্রশ্ন করলেন। "আমার খুব ভূতপ্রেত চর্চার শখ ছেলেবেলা থেকে। ভেবেছিলাম বিজ্ঞান পড়ব, তারপরে বিলেতে গিয়ে স্যার অলিভার লজের কাছে গবেষণা করব। কিন্তু স্কুল ছাড়তে না ছাড়তেই বাবার সঙ্গে ব্যবসায় নেবে পড়তে হল। বয়েস আর অধ্যবসায় থাকলে তোমার সঙ্গে লেগে পড়তাম এই কাজে। কিন্তু সে তো আর হবার নয়। কিন্তু আমি অন্ততঃ অর্থ দিয়ে যেটুকু সাহায্য পারি, সেটা করব। তোমার যদি কখনও মনে হয় অর্থের জন্যে তুমি এগোতে পারছ না, নির্দ্বিধায় আমার কাছে চলে আসবে।" কথা হল, প্রতি মাসে এক সন্ধ্যেয় এসে আমি মুকুন্দবাবুকে আমার গবেষণার প্রগ্রেস রিপোর্ট দিয়ে যাব।

বেশ ফুরফুরে মনে মুকুন্দবাবুর বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, দেখি মধুরিমা ঢুকছে। আমি তো চমকে চৌতিরিশ। মুকুন্দবাবুর কাছে মেঘ না চাইতে জল পাওয়া গেছিল। এ তো ডবল বাম্পার! মনে পড়ল, মধুরিমার পদবী মল্লিকই বটে। ওইটুকু সংবাদ জোগাড় করা গেছিল। আমি মল্লিকবাড়ি থেকে বেরিয়ে, মোড়ের পানের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা পান আর দামী সিগারেট কিনলাম। আয়েশ করে সিগারেট ধরিয়ে পানওলার সঙ্গে খেজুর করে প্রথমদিনে যতটা খবর জোগাড় করা যায় করে নিলাম।

এরপরে মাসে মাসে একদিন সন্ধ্যেবেলা গিয়ে মুকুন্দবাবুকে আমার গবেষণার গল্প শুনিয়ে আসতাম। যেতাম একটু সন্ধ্যে করে, যাতে মধুরিমাকে বাড়িতে পাওয়া যায়। দেখা না গেলেও গলার আওয়াজ তো পাওয়া যাবে! সন্ধ্যেবেলা গেলে আরেকটা লাভ ছিল। দুর্দান্ত জলখাবার পাওয়া যেত। লুচি-আলুদ্দম-ফিশফ্রাই-কাটলেট সঙ্গে ইয়াব্বড়া রাজভোগ, সন্দেশ। এরকম একদিন সন্ধ্যের মুখে হ্যারিসন রোডের মোড়ে বাস থেকে নেবে মল্লিকবাড়ির দিকে যাচ্ছি, পেছনে থেকে কে যেন ডাকল, "শুনছেন?" ঘুরে দেখি, মধুরিমা। কোনরকম ভনিতা না করে মধুরিমা জিগেস করল - আপনি নাকি ভূত নিয়ে রিসার্চ করেন?

হ্যাঁ, সেরকমই।
সায়েন্স কলেজে?
হ্যাঁ।
সায়েন্স কলেজ এইসব বুজরুকির জন্যে লোক পোষে?
সায়েন্স কলেজে আমার রিসার্চের বিষয় অন্য - পার্টিকল ফিজিক্স। ভূতের গবেষণা আমার নিজস্ব গবেষণা। কিন্তু বুজরুকি বলছেন কেন?
বুজরুকি নয় তো কী? ভূত বলে কিছু নেই।
আমি তর্ক করতে পারতাম। কিন্তু মধুরিমাকে চটানো ঠিক হবে না ভেবে বললাম, সেটাই তো প্রমাণ করার চেষ্টা করছি। মধুরিমা বলল, "তাই? তাহলে যে ছোটদাদু বলল, আপনি ভূত আছে প্রমাণ করেছেন? ভাঁওতা দিয়েছেন দাদুকে?" আমি হাঁ-হাঁ করে উঠলাম। "না, না, কী যে বলেন! পাগল নাকি? ওরকম একজন লোককে ভাঁওতা দেব?" মধুরিমা সন্দেহে চোখ সরু করে বলল, "বুঝিয়ে বলুন।" আমি কাতর স্বরে বললাম, "সে তো আর এইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বোঝান যাবে না। একদিন সময় করে বোঝাতে হবে।"
মধুরিমার সন্দেহ যায়নি, "ঠিক তো?"

"আপন গড।"
এরপরে মধুরিমার সঙ্গে দেখা হত মল্লিকবাড়িতেই। একদিন মুকুন্দবাবু বললেন, "মউকে তোমার গবেষণার বিষয়টা অল্প করে বুঝিয়ে দাও তো। সে ভূত-তুত কিছু মানতে চায় না। বিজ্ঞানের ছাত্রী নয় বটে, তবে প্রেসিডেন্সিতে পড়ছে। সহজে বললে, বুঝে যাবে।" মধুরিমা আমাকে তার ঘরে এনে পড়ার টেবিলে বসিয়ে বলল, "বোঝান।" আমি আর বোঝাব কী! গলা-টলা শুকিয়ে গেছে, হাতের চেটো ঠান্ডা হয়ে গেছে, তলপেটে মোচড় দিচ্ছে। কোনরকমে একটা খাতা টেনে সাইন কার্ভ-টার্ভ এঁকে আবোলতাবোল বকে গেলাম। সেদিনের পরে মধুরিমা নিশ্চিন্ত হয়ে গেল যে আমি ভয়ানক বুজরুক। ভাঁওতা দিয়ে তার ছোটদাদুকে গল্প শুনিয়ে ভালমন্দ খেয়ে যাই। ভাগ্যিস তাও ওঁর থেকে কোনরকম বদান্যতা এখনও নিতে হয়নি।

এরপর থেকে আমি প্রচন্ড ভয়ে ভয়ে মধুরিমাকে এড়িয়ে চলতাম। আমার মল্লিকবাড়িতে আসার টাইমটাও বদলে নিয়েছিলাম। তাও একদিন প্রেসিডেন্সিতেই আমাকে ধরে ফেলল। "এই যে! আপনাকে আজকাল দেখিনা যে? আজকাল আর আমাদের বাড়িতে যান না?" মিথ্যেটা চট করে এল না। বললাম, "যাই।"

কই, দেখি না তো?
আমি অন্য সময়ে যাই।
কেন?
আপনার সঙ্গে যাতে দেখা না হয়।
মধুরিমা হিহি করে হেসে বলল, "কেন? আপনার বুজরুকি ধরে ফেলেছি বলে?"

না, মানে, মনে হল আপনার ঠিক আমার রিসার্চ সম্বন্ধে ভাল ধারণা নেই। পছন্দ করেন না।
ভাল ধারণা তো নেইই। পছন্দও করিনা, বিশ্বাসও করিনা। যত্ত সব মাম্বোজাম্বো। কিন্তু সে আপনার আর ছোটদাদুর ব্যাপার। আমার কী। কিন্তু ছোটদাদু অন্ততঃ একজনের সঙ্গে তার প্রিয় বিষয়ে নিয়ে কথা বলতে যে ভালবাসছে, সেটাই আমার কাছে যথেষ্ট। বাড়িতে তো কেউ এ নিয়ে ওঁকে পাত্তা দেয়না। বরং হাসাহাসি করে। ছোটদাদু তাই ও বাড়িতে কথা বলা ছেড়েই দিয়েছে। আপনার পাল্লায় পড়ে তাও দেখি আবার একটু ওসব নিয়ে কথা বলছে। আপনি যে সময়ে যেতেন, সে সময়েই যাবেন। পোষা ভূত থাকলে তাদেরও নিয়ে যাবেন। হিহি।
এ এক অদ্ভুত গাড্ডা! মধুরিমাকে দেখতে, তার সঙ্গে কথা বলতে প্রচন্ড আকর্ষণ বোধ করি। কিন্তু আবার খুব ভয়ও পাই। আমার রিসার্চকে একেবারে নস্যাৎ করে যে শুধু দেয় তাই নয়, তার চোখের ভাষাতেও দেখি, সে আমাকে বুজরুক ভাবে। কাজেই আমি যত সম্ভব এড়িয়ে চলতে লাগলাম।

এর মধ্যে একটা ব্যাপার হল। একদিন কলেজ থেকে বেরোবার সময়ে কলেজের সামনেই আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হল। সায়েন্স কলেজের মেধাবী গবেষকের দুর্ঘটনা বলে কাগজে একটা ছোট খবরও বেরল। সেখানে আমাদের হেড বাইট দিলেন। আমার যে পার্টিকল ফিজিক্সের বাইরে ভূত নিয়েও গবেষণা আছে, সে কথা লেখা হল। সেই সূত্রে অলিভার লজের রেফারেন্স দিলেন হেড। বিখ্যাত ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক স্যার অলিভার লজ যেরকম রেডিও, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ নিয়ে গবেষণার পাশে স্পিরিচুয়ালিজম নিয়ে আর ভূত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, আমার কাজও সেইরকম। আমি তো আহ্লাদে আটখানা।

কিছুদিন পরে আমি পটলডাঙায় সিঙ্গিদের বাড়িতে চলে এলাম। মল্লিকবাড়ির প্রায় উল্টোদিকই বলা যায়। সামনাসামনি নয়, পিছোপিছি। দুবাড়ির সদর দরজা দু রাস্তায়। মাঝে কানাগলি। কাজেই মধুরিমার চোখে না পড়েও তাকে আমি নিয়মিত দেখতে পেতাম, কথা শুনতে পেতাম। সেও আমার গান শুনতে পেত। কিন্তু নিশ্চয়ই গলা চিনতে পারত না। মেসে আমার সঙ্গে থাকতেন ঘোষদা। আদতে সালকের লোক। মাইডিয়ার। একদিন আমাকে বললেন, "ব্রাদার, তোমাকে কদিন ধরে লক্ষ্য করে বুঝেছি, সামথিং ইস কুকিং। মল্লিকবাড়িতে কিসের টান হে ছোকরা?" আমি ঘোষদাকে সব খুলে বললাম। ঘোষদা সব শুনে পা দোলাতে দোলাতে থেমে থেমে পাঁচটা "হুঁ" দিলেন। তারপরে বললেন, "ব্যাপার বড়ই গুরুতর ব্রাদার। এ যা ব্যাপার বাঁধিয়েছ, বোঝ তো যে এ এক অসম্ভব প্রেম। তোমাদের এক হবার তো আপাতত কোন উপায় দেখছি না। আশু কোন সমাধান নেই। তবে আমি বলি, সময় করে একদিন তুমি মধুরিমার সঙ্গে দেখা করে, সব খুলে বল। নিজের একটু হাল্কা লাগবে।"

বলা তো সোজা, করা যে কী শক্ত সে একমাত্র আমিই জানি। ঘোষদাও মাঝে মাঝেই খোঁচাচ্ছেন, "কী ব্রাদার? কী ভাবলে?" এরকম কয়েকদিন হবার পরে আমি 'ধুত্তোর' বলে একদিন সন্ধ্যেবেলা সটান মল্লিকবাড়িতে ঢুকে পড়লাম। মধুরিমার ঘর আমার চেনা। তিনতলার ওপর। আমি সোজা সেখানে পৌঁছে গেলাম। মধুরিমা আমাকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেল। আমি বললাম, "আমি একটা কথা বলতে এসেছি।" মধুরিমা বলল, "তার আগে আমার আপনাকে সরি বলা উচিত। আমি আপনার রিসার্চকে কত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছি। আমি খুব সরি।" আমি হেসে বললাম, "আমার রিসার্চ যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতন নয়, জানলে কী করে?" মধুরিমা বলল, "কেন, কাগজেই তো বেরিয়ে ..." - এইটুকু বলেই তার চোখমুখ অন্যরকম হয়ে গেল। গোঁগোঁ শব্দ করে মধুরিমা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। আর পড়বি তো পড়, মাথা গিয়ে পড়ল চৌকাঠের ওপর। পুরনো আমলের বাড়ি। ভারী, মোটা কাঠের চৌকাঠ। একটা ঢক করে বিরাট শব্দ হল। আমি বুঝতে পারলাম ওই এক আঘাতেই মধুরিমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল।

এরপরে আমাদের মিলনে আর বাধা রইল না। মধুরিমা লাজুক হেসে বলল, "তুমিই যে তোমার প্রমাণ সেটা বুঝতে পেরেই মাথাটা কেমন হয়ে গেছিল। ছোটদাদুর কাছে শুনেছিলাম, তুমি আর নেই।" ও, বলতে ভুলে গেছিলাম, বাসের অ্যাক্সিডেন্টের পরে কিছুদিন কোমায় থেকে আমি মরে গেছিলাম। আমি এখন ভূত। মধুরিমাও।


~ সম্বিত বসু ~

About the Author:

সম্বিত বসু,জন্ম ষাটের দশকের শেষে। জন্মসূত্রে মোহনবাগান ও উত্তর কলকাতা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ছুতোয় ল্যাদ ও আড্ডায় পাক্কা ট্রেনিং। ১৯৯৩ সালে উচ্চশিক্ষায় বিদেশ আগমন ও ঠ্যালার-নাম-বাবাজী দর্শন। গ্রাসাচ্ছাদন, তথ্য-প্রযুক্তির সূতিকাগার, সিলিকন ভ্যালির ছোট-বড় কোম্পানিতে। ব্যক্তিগত প্রবন্ধের সংকলন - "আপন বাপন জীবন যাপন"। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আপাততঃ একটিই। প্রবন্ধ-টবন্ধ বেরিয়েছে এদিক-সেদিক। স্ত্রী পারমিতা ও দুই কন্যা-সহ বাস করেন ক্যালিফোর্নিয়ায় স্যান ফ্র্যানসিসকো শহরের তলিতে। স্বপ্ন দেখেন একদিন কলকাতায় ফিরে পেশাদার আড্ডাবাজের জীবন ফিরে পাবেন।



Comments & Related Articles

Read more reflections on life, art, and the human spirit from our contributors.

Ganga Zuari International: Connecting Cultures Across the Globe

Join us in promoting cross-cultural dialogue, preserving heritage, and fostering global collaborations through art, literature, music, and festivals.

Latest Events View Activities
Blog - Mélange Read Articles