বহু বিদ্যা, তীক্ষ্ণ বোধ, তথাপি নির্বোধ – ২ | অরিজিৎ কথঞ্চিৎ

Article Image

অরিজিৎ কথঞ্চিৎ

বহু বিদ্যা, তীক্ষ্ণ বোধ, তথাপি নির্বোধ - ২

সিপোলার কাজ

 

নাৎসি গেলো, সবার বয়স সিকি শতাব্দী বাড়লো,

মানুষ মোটে চারটি প্রকার- বলেন সিপোলা কার্লো।

নির্বুদ্ধিতা নিয়ে বনহোফার-এর ১৯৪৩ সালের চিঠিটি মুলতঃ একক চিন্তাভিত্তিক। তাঁর অনেক পরে ইতালিয়ান অর্থনীতির ইতিহাসবিদ কার্লো এম সিপোলা বিষয়টি নিয়ে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ করে ১৯৭৬ সালে ‘দ্য বেসিক ল’জ অফ হিউম্যান স্টুপিডিটি’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন, সেটিতে নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে নীচের পাঁচটি সূত্র দেওয়া আছে।

  • সূত্র ১: অবধারিত ভাবে সমাজে নির্বোধ মানুষের সংখ্যাকে কম করে দেখা হয়।
  • সূত্র ২: কোন মানুষ নির্বোধ হবার সম্ভাবনা সেই ব্যক্তির শিক্ষা, বুদ্ধি, আর্থ-সামাজিক স্তর বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না।
  • সূত্র ৩: নির্বোধ মানুষ অন্যদের ক্ষতি করে কখনোই নিজে লাভবান হতে পারেন না, বরং প্রায়ই নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হ’ন।
  • সূত্র ৪: সাধারণতঃ নির্বোধদের ক্ষতি করার ক্ষমতাকে ছোট করে দেখা হয়। সাধারণ মানুষ ভুলে যায় যে নির্বোধদের সঙ্গ যে কোন কাজে ক্ষতিকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
  • সূত্র ৫: নির্বোধ মানুষ সকলের চেয়ে বেশী বিপজ্জনক।

বনহোফার-এর সাথে সিপোলার ঐকমত্য তিনটি জায়গায়-

  • ক) নির্বুদ্ধিতার প্রভাব সর্বব্যাপী।
  • খ) সমাজের সব স্তরে, সব দেশে নির্বোধ মানুষ থাকেন।
  • গ) নির্বোধরা শুধু নিঃস্বার্থই নন, তাঁরা নিজের ভালো বুঝতেও অক্ষম। তাঁদের মন যুক্তির পথ ধরে চলে না বলে কখন (দীর্ঘস্থায়ী) তাঁরা ক্ষতি করে বসতে পারেন, তা আগে আন্দাজ করে তার প্রতিরোধ প্রায় অসম্ভব।

    একটি মূল পার্থক্য হ’ল, বনহোফার নির্বুদ্ধিতাকে একটি জীবৎকালে অর্জিত দোষ মনে করেছেন আর সিপোলা বলেন দোষটি জন্মগত (জেনেটিক)। আর একটি তফাৎ হ’ল, সিপোলা বলেন, যে কোন সমাজে, যে কোন স্তরে নির্বোধদের উপস্থিতির অনুপাত এক ও অপরিবর্তনীয়, আর বনহোফার-এর মতে তাদের সংখ্যাটি পরিবেশের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল। এই লেখকের মতে দেশ-বিদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা নির্বোধদের সংখ্যনুপাতের ক্ষেত্রে বনহোফার-এর কথাটিকেই সমর্থন করে।

    সিপোলা পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষদের পাঁচটি ভাগ করেন- শ্রমিক, অফিস কর্মী, ছাত্র, প্রশাসক ও অধ্যাপক। প্রথমে শ্রমিকদের পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে নির্বোধ মানুষের অনুপাত যতটা আন্দাজ করা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি (প্রথম সূত্র)। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয়েছিল দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাবের জন্য এমনটি হয়েছে। কিন্তু, পরবর্তী স্তরগুলিতে পরীক্ষা করে দেখা যায় নির্বোধ মানুষের অনুপাত সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত একই থাকে। অর্থাৎ, সবচেয়ে নীচু স্তরে যদি দশজন শ্রমিকের মধ্যে চারজন নির্বোধ হন, দশজন অধ্যাপকের মধ্যেও চারজন নির্বোধ পাওয়া যাবে। এ রকম পাবার পর সিপোলা নোবেলজয়ীদের মধ্যেও পরীক্ষা করে দেখেন সেখানেও নির্বোধদের অনুপাত এক।

    তাঁর পরীক্ষার ভিত্তিতে সিপোলা সমস্ত জনগোষ্ঠীকে যে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন সেগুলি হ’ল-

    ● প্রজ্ঞাবান (Intelligent)- এঁরা অপরের ভাল করেন, নিজেরাও লাভবান হন।

    ● প্রতারক (Bandit)- এঁরা অন্যের ক্ষতি করে নিজেরা লাভ করেন।

    ● নির্বোধ (Stupid)- এঁরা উভয়তঃ অন্যের এবং নিজের ক্ষতি করেন।

    ● অসহায় (Helpless)- এঁরা অন্যকে লাভবান করে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হ’ন।

    এতটা এগোনোর পর সমস্ত দেশে সমস্ত স্তরে বিশাল বা ক্ষুদ্র সমস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে নির্বোধদের অনুপাত একই থাকবে বলেও সিপোলা সে অনুপাতটিকে শতকরা সংখ্যার একটি সাঙ্কেতিক চিহ্ন সিগমা দিয়ে বোঝালেন কেন সে প্রশ্ন থেকে যায়। আরও মনে হয়, কোন মানুষ একান্ত ব্যতিক্রমী না হলে সর্বক্ষেত্রে নির্বোধ (যুগপৎ নিজের ও অপরের ক্ষতিকারক) হতে পারে না। যদি তেমন হ’ত তাহলে সে মানুষটি কোন কাজই করতে পারত না। সে জন্য নির্বুদ্ধিতাকে কোন বিশেষ ব্যক্তির সাথে গুলিয়ে না ফেলে সকলের মধ্যেই মাঝে মাঝে সংক্রমিত একটি অসুখ হিসেবে দেখা ভাল।

    বনহোফার আর সিপোলা দুজনেই বলেন নির্বুদ্ধিতা আমাদের আশেপাশে থাকবেই। সেটি এমনিতেই নিজের আর অন্যের ক্ষতি করতে থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা পেলে নির্বুদ্ধিতা বিধ্বংসী হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাকিদের চেষ্টা হওয়া উচিৎ বড় কোন ক্ষমতার আসনকে নির্বুদ্ধিতার প্রভাব থেকে দূরে রাখা। তার আগে সমাজে মুর্খামির জোয়ার-ভাঁটা ঘটে কেন, অর্থাৎ মানুষ কী ভাবে নির্বুদ্ধিতার প্যাঁচে পড়ে সেটি বোঝা প্রয়োজন।

    প্রচার আর গল্পের জের

    বার বার শোনা মিথ্যে সত্য হেন লাগে,

    জানি সবাই, এই দেশটি স্বর্গ ছিল আগে।

    একই কথা, কাল্পনিক হলেও বারবার, সর্বত্র বলতে থাকলে সেটি সত্য বলে প্রতিভাত হয়। যেমন ধরুন, যখন হানিবাল, খলিফা অথবা রাম রাজত্ব করতেন সেই সব যুগে, ঠিকমত সুখ-অসুখ মাপা সার্ভে, পোলিও ভ্যাকসিন, অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারেরও আগে মানুষ অনেক সুখে ছিল- বহু লোক এ রকম বিশ্বাস করে। যারা বলছে আমরা ঐ রকম সুখ (ঠিক কী রকম “আমরা জানি না, জানে না কেউ”) এনে দেব, যাদের প্রচারমাধ্যম ‘নিজের লোককে একটু বিশ্বাস করলে ক্ষতি কি?’ বলে আকাশ ভরে রাখছে, তাদের পিছনে হাঁটছে শুধু অশিক্ষিত নয়, অতিশিক্ষিতও, তার কারণ মানুষের ভাবনা সর্বদা যুক্তির পথে চলে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর আমেরিকাকে আবার মহান কর (Make America great again) স্লোগান নিয়ে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘মহান দেশ বলতে কী বোঝায়?’ ‘আমেরিকা ঠিক কবে মহান ছিল?’- নিশ্চিতভাবে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে না। মধুর গল্পের প্রতি মানুষের ভালবাসা বার বার সাধারণ বুদ্ধিকে ছাপিয়ে যায় আর সিপোলার প্রতারকরা সেই ভালবাসাকে শিখণ্ডী করে বিশ্বাসীদের ভিখারী করে নিজেরা বড়লোক হবার উদ্যোগ নেয়।

    আলস্য

    মাথা খাটাতে বিমুখ মানুষ আলস্যতে হায়

    দেখতে নারে ফাঁকি দিয়ে ভবিষ্যৎ পালায়।

    নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কাহনেম্যান তাঁর বই থিংকিং ফাস্ট অ্যান্ড স্লো-তে লিখছেন, আমরা এম আই টি, প্রিন্সটন ও হার্ভার্ডের কয়েক হাজার ছাত্রকে যে সরল প্রশ্নটি করি তা হ’ল- একটি ব্যাট ও একটি বলের মোট দাম ১১০ ডলার। ব্যাটটির দাম বলের চেয়ে ১০০ ডলার বেশি হলে বলটির দাম কত? বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিভাবান ছাত্রদের অন্ততঃ পঞ্চাশ শতাংশ ঠিক উত্তর ৫ ডলারের জায়গায় ১০ ডলার বলে। এরা কিন্তু অনেক শক্ত প্রশ্ন সমাধান করতে পারে। ভুল করার কারণ আলস্য। কাহনেম্যান বলেন মানুষ স্বভাবতঃ অলস। গভীর ভাবনার কষ্ট সইতে নারাজ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই সে সহজ সমাধান পেলেই তাকে আঁকড়ে ধরে (Law of least effort)। ইহুদিদের নিকেশ করলেই স্বর্গলাভ হবে, কোরানের আয়াত আওড়ালে বা সরস্বতী পুজোয় ভক্তিভরে অঞ্জলি দিলে অঙ্ক পরীক্ষায় পাশ করা যাবে ইত্যাদি সিদ্ধান্ত- সেই আলসেমির উদাহরণ। দুঃখের বিষয় পৃথিবী যতটা সরল হলে ভাল হত ততটা নয়। বড় সমস্যার সহজ সমাধান এলে সেগুলিকে সন্দেহ না করলে অবস্থা হবে আরবের মত। আগেই লিখেছি, অষ্টম থেকে দ্বাদশ খৃষ্টাব্দ অব্দি আরবের মনীষা জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, স্থাপত্য এমন কি সাহিত্যক্ষেত্রকে উজ্জ্বল করে রেখেছিল। পরবর্তীকালে উগ্র ইসলাম ‘ধর্মীয় নিয়ম পালন করে গেলেই সব হবে’, ‘বেশী পরিশ্রম করতে হবে না’ ইত্যাদি বুঝিয়ে দেবার পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা যে ভাবে পরনির্ভর আর পশ্চাৎপদ হয়ে পড়েছে তার আর শেষ দেখা যাচ্ছে না।

    সংখ্যাধিক্যে অন্ধ বিশ্বাস

    মাথা গুণে সায় দিলে, সমাধান কি পেলে?

    একক মনের গহীনে সেটি উজল পাপড়ি মেলে।

    জনপ্রিয়তা যোগ্যতার বিকল্প নয়। সকলে যখন বলছে, ঠিক হবেই- এই ভাবনা থেকে বাঁচা দরকার, কারণ সত্য প্রায় কখনোই একসাথে সকলের মনে উদয় হয় না। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ, ইউক্লিডের জ্যামিতি, আর্কিমিডিসের প্লবতা তত্ত্ব, আইনস্টাইনের আপক্ষিকতা অনেকে একসাথে আবিষ্কার করেন নি। তবুও, মানুষ সলোমন অ্যাশ-এর পরীক্ষা (আগের পর্বে দেখুন)-য় যেমন, ‘অনেকে যা বলছে তাহাই ধ্রুব সত্য’ এমন ভাবনা ছাড়তে পারে না। রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি পাবার পর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উন্নতি দেখে সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যাঁদের সব মনে হয়, তাঁরা ভুলে যান যে মেজরিটির সম্ভাব্য ভুল সিদ্ধান্তগুলিকে নিরস্ত করার জন্য নির্বাচিত আইনসভার পাশাপাশি স্বাধীন আমলাতন্ত্র আর বিচারপদ্ধতির ব্যবস্থা করা থাকে। বেশির ভাগ মানুষ যে ধর্মের বা গোষ্ঠীর- দেশের প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা এমন কি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও সেই ধর্মের বা গোষ্ঠীর ধামা ধরে চললে দেশ ও সমাজে দুর্দশার, সুখহীনতার যে নব দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়, তার জাজ্বল্যমান আধুনিক উদাহরণ আফগানিস্তান। সেই আফগানিস্তান, যেখান থেকে ১৯৫০ এর দশকে শান্তিনিকেতনে এক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল এলে তৎকালীন উপাচার্য ক্ষিতিমোহন সেন তাঁদের স্বাগত জানিয়ে গান্ধারদেশের সাথে হিন্দুস্থানের দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা স্মরণ করেন এবং বলেন “আফগানিস্তানের কাছে ভারতবর্ষের ভাষাবিদ্যা, ব্যাকরণ, শিল্পকলা ও সঙ্গীতের অনেক ঋণ।”

    আত্মবিস্মরণ

    ঢাকের তালে নাচতে থাকি, তার শব্দে হায়,

    কখন যেন সৎবুদ্ধি সুদূরে পালায়।

    উপায় জানলে মানুষকে তার নিজের প্রয়োজন ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ভাষার খেলা আর প্রচারে ভুলে সে নিজের ক্ষতি করে প্রতারকদের লাভ বাড়ানোর চেষ্টায় মাতে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ভাইপো এডওয়ার্ড বারনেস (১৮৯১-১৯৮০) এই চিন্তার পথপ্রদর্শক। তাঁর কাজ থেকে বোঝা যায়, মানুষের যথার্থ প্রয়োজন না মিটিয়ে নতুন কৃত্রিম প্রয়োজন সৃষ্টি করে সেদিকে পুরো ব্যাপারটি ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব- যেমন ধরুন, হাজার হাজার বছর ধরে সসম্মানে টিঁকে থাকা ঈশ্বর বড় অসহায়, ‘তাঁর সম্মান তোমাদেরই রক্ষা করতে হবে’ বোঝাতে পারলে যে নির্বুদ্ধিতার বন্যা নামে তাতে নিজেদের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসার প্রয়োজন স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে মানুষ দাঙ্গা করতে এমন কি প্রাণ বিসর্জন দিতে রাজি হয়ে যায়।

    বারনেস জিনিষ বিক্রি না করে ধারণা (idea or image) বিক্রি করার কথা বলেন। মেয়েদের সিগারেট খাওয়ার দ্বিধা কাটাতে সেই তামাকভর্তি ক্ষতিকর জিনিষটির নাম দেন মুক্তির আলো (Torch of freedom) এবং প্রচার করেন যে সিগারেট একই সাথে গলার অস্বস্তি দূর করে আর কোমরের মেদ কমায়। এ সব বিজ্ঞাপন সফল হয়ে যখন অন্য মহিলাদের সিগারেটের নেশা ধরাচ্ছে,তখন বারনেস বাড়ীতে নিজের স্ত্রী সিগারেট কিনলে সেগুলিকে কেটে টয়লেটে ফেলে ফ্লাশ করে দিতেন। বারনেস এর সাফল্যে উৎসাহিত গোয়েবলস ইহুদিহত্যাকে শেষ সমাধান আর বিশ্বযুদ্ধকে বিশ্বের কল্যাণের পথ বলে ফিরি করে নির্বুদ্ধিতার যে সংক্রমণ ঘটান তাতে বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারান প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।

    উপায় তবে কি

    অনেক অনেক ভয় দেখালে, জানতে ইচ্ছে হয়,

    নির্বুদ্ধিতা থেকে বাঁচার কোন আছে কি উপায়?

    স্থির সংকল্পের সাথে সদভ্যাস যোগ দিলে উপায় হতে পারে। নীচে রইলো সদভ্যাসের কয়েকটি উদাহরণ।

    ● যে কোন বিষয়ে নিজে প্রশ্ন করা, অন্যদের প্রশ্ন করার পরিবেশ টিঁকিয়ে রাখা, কারণ বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়ার কুঅভ্যাস ছড়াতে ছড়াতে সামাজিক মহামারীর রূপ নিতে পারে।

    ● আইনশৃঙ্খলা এতটা ভাল রাখা যে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে কাউকে নিজের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে দলে ভিড়তে না হয়।

    ● কী চাইছির চেয়ে ‘কেন চাইছি’র ওপর বেশী গুরুত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা স্বাতন্ত্র্য ও স্বনিয়ন্ত্রণ। উদাহরণ- আমেরিকানদের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা শান্তিতে খেয়ে প’রে বেঁচে থাকার কিন্তু, ব্যাপারটি ঠিক কী না জেনেই তারা দেশকে আরও মহান করার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে।

    ● দেশ ও সামজের ওপর নির্বুদ্ধিতার সংক্রমণকে অতিমারীতে পরিণত করে যারা লাভবান হতে চায়, সেই প্রতারকরা ক্ষমতা পাবার আগে যখন বলতে শুরু করে ‘নিজে কষ্ট করে ভাবার কী প্রয়োজন, আগেই তো গুরুরা সব ভেবে রেখেছেন’ তখন রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা…

    পুরনো চিন্তায় আজকের সবকিছুর সমাধান হবে না, কারণ “এ জীবন নিত্যই নূতন…”। রাম, যীশু বা খলিফার আমলে মানুষ কম্পিউটার, টিভি বা ট্যাব নিয়ে বসে ‘লাইফ-স্টাইল’ অসুখ তৈরি করে নি, গ্রাম ছেড়ে শহরের ফুটপাথ বা বস্তিতে থাকার অভিজ্ঞতাও ছিল তাদের কল্পনাতীত।

    ● ‘কে কী বলল’, ‘কী পরলো’ ধরণের প্রশ্নে আটকে না পড়ে নিজেদের বাস্তব সমস্যাগুলি বোঝা এবং দৈনন্দিন কোলাহল ও বিবাদ থেকে যতদূর সম্ভব মুক্ত থেকে তাদের নিয়ে ভাবা, অন্ততঃ ভাবার চেষ্টা করা।

    প্রতারকরা জানে, মনের ক্ষমতা সীমিত। তারা এটাও জানে, রোজ খবরের নামে নানা উত্তেজক বা মজাদার হালকা বিষয়, যেমন করিনা কাপুর ক্রিকেট নিয়ে কী বললেন, অমুক রাজনীতিক-এর দোলের দিনে পাঞ্জাবি না পরাটা উচিৎ হল কি না, রতন টাটা’র প্রিয় কুকুরটি কী করছে, কপিল জোশির কমেডি শো’তে মেধা পাটকর এলেন না কেন’ ইত্যাদি দিয়ে মগজে ট্র্যাফিক জ্যাম করে রাখতে পারলে সরকারী তথ্য অনুযায়ী ‘দেশে এক লক্ষেরও বেশী স্কুল একজন মাত্র শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে কেন, কেন প্রায় চার কোটি শিশু ও কুড়ি কোটি মহিলা যথাক্রমে অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভুগছে’, এসব নিয়ে ভেবে আকুল হওয়ার সুযোগ পাবে না মানুষ।

    ১২ই আগস্ট, ২০২৫ অরিজিৎ চৌধুরী


    তথ্যসূত্র

    The Basic Laws of Human Stupidity- Carlo M Cipolla, Societa editrice il Mulino. Bologna, 2011 cipolla1976.pdf

    ক্ষিতিমোহন সেন ও অর্ধশতাব্দীর শান্তিনিকেতন- প্রণতি মুখোপাধ্যায়, প্রকাশক পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি, ২০১৮

    Thinking Fast and Slow- Daniel Kahneman, Penguin Books, 2024

    The manipulation of the American mind: Edward Bernays and the birth of public relations

    UDISE Plus 2023-24: Nearly 40 lakh students in 1 lakh single-teacher schools

    India's Nutrition Crisis: Highest Child Wasting Rate Despite Undernourishment Drop


    About the Author:

    Arijit Choudhuri, located in Navi Mumbai, petroleum geologist by profession. Also interested in issues concerning pollution, climate change and fast depleting groundwater reserves.Travelling, reading, writing articles, composing rhymes and recitation are his hobbies.



Comments & Related Articles

Explore perspectives that expand your understanding of intellect, culture, and society.

Ganga Zuari International: Connecting Cultures Across the Globe

Join us in promoting cross-cultural dialogue, preserving heritage, and fostering global collaborations through art, literature, music, and festivals.

Latest Events View Activities
Blog - Mélange Read Articles